


তিনটি গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে ইউসিবি স্টক ব্রোকারেজের বিরুদ্ধে। এরফলে বড় ধরনের শাস্তির মুখে পড়েছে পুঁজিবাজারের সদস্যভুক্ত ব্রোকারেজ হাউজটি (ট্রেকহোল্ডার) এবং এর ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
বিনিয়োগকারীর অগোচরে তথ্য পরিবর্তন, ভুয়া পোর্টফোলিও বিবরণী প্রদান এবং গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র গায়েব করার মতো গুরুতর অপেশাদার আচরণের দায়ে প্রতিষ্ঠানটিসহ তার চার কর্মকর্তাকে মোট ৬৬ লাখ টাকা জরিমানা করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
বিনিয়োগকারী মো. আইয়ুব আলীর দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত সাপেক্ষে এসব অনিয়মের সত্যতা পাওয়ায় কমিশন এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সূত্রে জানা গেছে, বিনিয়োগকারী আইয়ুব আলীর অজান্তেই তার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত তথ্য পরিবর্তন, ভুয়া হিসাব বিবরণী তৈরি এবং প্রয়োজনীয় নথি সংরক্ষণে চরম গাফিলতির মতো একাধিক গুরুতর অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে।
বিনিয়োগকারীর অনুমতি ছাড়াই তার মোবাইল নম্বর ও ইমেইল ঠিকানা পরিবর্তন করে অন্য নম্বর সংযুক্ত করা হয়, যা সরাসরি সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘন। এই অপরাধে ইউসিবি স্টক ব্রোকারেজ, প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মোহাম্মদ রহমত পাশা, কর্মকর্তা মো. শহীদুজ্জামান, রফিকুল ইসলাম ও আব্দুল আহাদ শেখকে পৃথকভাবে অর্থদণ্ড আরোপ করা হয়।
এছাড়া বিনিয়োগকারীকে বিভ্রান্ত করতে ভুয়া ও বানোয়াট পোর্টফোলিও স্টেটমেন্ট সরবরাহের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এবং বিনিয়োগকারীর বিও হিসাব খোলার মূল ফরম সংরক্ষণে ব্যর্থতার জন্য সংশ্লিষ্টদের অতিরিক্ত জরিমানা আরোপ করা হয়েছে।
কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ইউসিবি স্টক ব্রোকারেজ লিমিটেডকে মোট ৩০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া এমডি ও সিইও মোহাম্মদ রহমত পাশা এবং কর্মকর্তা মো. শহীদুজ্জামানকে ১৫ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। অপরদিকে কমপ্লায়েন্স অফিসার রফিকুল ইসলাম ও কর্মকর্তা আব্দুল আহাদ শেখকে ৩ লাখ টাকা করে জরিমানা গুনতে হবে।
তথ্য পরিবর্তন ও বিধি লঙ্ঘন: বিনিয়োগকারীর যথাযথ অনুমোদন ব্যতিরেকে তার মোবাইল নাম্বার ও ইমেইল ঠিকানা পরিবর্তন করে অন্য মোবাইল নাম্বার ও ইমেইল (যা বিনিয়োগকারীর নয়) অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন (স্টক-ডিলার, স্টক-ব্রোকার ও অনুমোদিত প্রতিনিধি) বিধিমালা, ২০০০ এর বিধি ১১ ও দ্বিতীয় তফসিলের আচরণ বিধি ১ এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন ১৯৯৩ এর ধারা ১৮ লঙ্ঘন হয়েছে। এই অপরাধে ইউসিবি স্টক ব্রোকারেজকে ১০ লাখ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মোহাম্মদ রহমত পাশাকে ৫ লাখ, অফিসার মো. শহীদুজ্জামানকে ৫ লাখ এবং কমপ্লায়েন্স অফিসার রফিকুল ইসলাম ও অফিসার আব্দুল আহাদ শেখকে ১ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে।
ভুয়া পোর্টফোলিও বিবরণী প্রদান: বিনিয়োগকারীকে অসত্য ও বানোয়াট পোর্টফোলিও বিবরণী প্রদানের মাধ্যমে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯ এর ধারা ১৮ ও ২২ লঙ্ঘন, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন, ১৯৯৩ এর ধারা ১৮ এবং সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন (স্টক-ডিলার, স্টক-ব্রোকার ও অনুমোদিত প্রতিনিধি) বিধিমালা, ২০০০ এর বিধি ১১ ও দ্বিতীয় তফসিলের আচরণ বিধি ১ লঙ্ঘন হয়েছে। এই অপরাধেও ইউসিবি স্টক ব্রোকারেজকে ১০ লাখ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মোহাম্মদ রহমত পাশাকে ৫ লাখ, অফিসার মো. শহীদুজ্জামানকে ৫ লাখ এবং কমপ্লায়েন্স অফিসার রফিকুল ইসলাম ও অফিসার আব্দুল আহাদ শেখকে ১ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে।
নথিপত্র গায়েব ও তথ্য গোপন: বিনিয়োগকারীর বিও হিসাব খোলার ফরম সংরক্ষণ না করা তথা হারানো এবং বিষয়টি গোপন করে ও গ্রাহকের সম্মতি ছাড়াই বিও হিসাব ফরমে অসত্য তথ্যের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ রুলস, ২০২০ এর রুল ৫(২)(ই); সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন (স্টক-ডিলার, স্টক-ব্রোকার ও অনুমোদিত প্রতিনিধি) বিধিমালা, ২০০০ এর বিধি ১১ ও দ্বিতীয় তফসিলের আচরণ বিধি ১: বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন, ১৯৯৩ এর ধারা ১৮ এবং সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন অর্ডিনেন্স, ১৯৬৯ এর ধারা ১৮ ও ২২ লঙ্ঘন হয়েছে। একই অপরাধে ইউসিবি স্টক ব্রোকারেজকে ১০ লাখ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মোহাম্মদ রহমত পাশাকে ৫ লাখ, অফিসার মো. শহীদুজ্জামানকে ৫ লাখ এবং কমপ্লায়েন্স অফিসার রফিকুল ইসলাম ও অফিসার আব্দুল আহাদ শেখকে ১ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, বিনিয়োগকারীর তথ্যের নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গ্রাহকের তথ্য জালিয়াতি বা প্রতারণার ঘটনা প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তি আরোপ করার বিকল্প নেই। বিএসইসির এই পদক্ষেপ বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে। বিশেষ করে ব্রোকারেজ হাউজগুলোর অনিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ড বন্ধে এ ধরনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এ ব্যাপারে ইউসিবি স্টক ব্রোকারেজ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মোহাম্মদ রহমতের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, বিষয়টি বর্তমানে তদন্তাধীন এবং একটি চলমান মামলা হওয়ায় এখনো চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়নি।
তিনি আরও বলেন, বিষয়টি সাবজুডিস অবস্থায় রয়েছে। বিএসইসি থেকে আমরা অবগত হয়েছি যে, পিবিআই-এর তদন্ত প্রতিবেদন প্রাপ্তির পরই কমিশন তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।
মন্তব্য করুন