বুধবার
১৫ এপ্রিল ২০২৬, ২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বুধবার
১৫ এপ্রিল ২০২৬, ২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সিএমএসএমই খাতই পারে অর্থনীতিকে গতিশীল করতে: অর্থ উপদেষ্টা

এনপিবি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:২৬ পিএম আপডেট : ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৪৪ পিএম
ছবি সংগৃহীত
expand
ছবি সংগৃহীত

দীর্ঘদিন যাবত ব্যবসা সহায়ক পরিস্থিতির অভাবে শিল্পখাতে উৎপাদন হ্রাস, বকেয়া ঋণ বৃদ্ধি, উচ্চ খেলাপী ঋণ, বেসরকারিখাতে ঋণ প্রবাহ হ্রাস এবং সরকারের ঋণ গ্রহণ বৃদ্ধির কারণে দেশের শিল্পখাত মারাত্নক চ্যালেঞ্জিং সময় অতিবাহিত করছে। এ অবস্থা উত্তরণে ব্যাংক খাতের কাঠামোগত দূর্বলতার সংষ্কার, স্থিতিশীলতা ও সুশাসন নিশ্চিতকরনের পাশাপাশি ব্যাংক ও বেসরকারিখাতের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় বাড়ানোর উপর জোরারোপ করেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি তাসকীন আহমেদ।

বুধবার (১৫ এপ্রিল) ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘ব্যাংকিং খাতের সমন্বয়ঃ ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতার দৃষ্টিভঙ্গি’ শীর্ষক ফোকাস গ্রুপ আলোচনায় তিনি এ অভিমত জ্ঞাপন করেন ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত এ আলোচনা সভায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা প্রফেসর ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানের সূচনা বক্তব্য ও মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, 'বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে এক চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং এ খাতের টেকসই ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধির জন্য ব্যাংক ও বেসরকারিখাতের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় এখন সময়ের দাবী। তিনি জানান, আমাদের ব্যাংকখাতে তারল্যের সংকট নেই, বরং রেকর্ড ৩ লাখ ২১ হাজার ২৫৫ কোটি টাকার অতিরিক্ত তারল্য রয়েছে, তারপরও বর্তমানে বেসরকারিখাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি সংকুচিত হয়ে ৬ দশমিক ০৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৭ দশমিক ১৫ শতাংশের অনেক কম। তিনি আরো বলেন, শিল্প খাতের মোট ঋণের বর্তমানে ৫০ দশমিক ৪৬ শতাংশ অনাদায়ী এবং খেলাপি ঋণের হার ৩১ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছানোয় ব্যাংকগুলো এখন চরম আতঙ্কে ভুগছে সেই সাাথে এসএমই উদ্যোক্তাদের নেওয়া ঋণের ৩৫ দশমিক ৪৩ শতাংশও এখন সময়মতো পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায়, তারা খেলাপী হয়ে গেছেন।'

খেলাপী ঋণ বৃদ্ধির ফলে ব্যাংকের সম্পদ ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাওয়া মূলধন সংকট এবং ব্যবসায়িক ঋণের চেয়ে ট্রেজারি বিলে বিনিয়োগে প্রাধান্য দেওয়া প্রভৃতি কারণে ব্যাংগুলো ঋণ প্রদানে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে, বলে মত প্রকাশ করেন ডিসিসিআই সভাপতি। অপরদিকে দীর্ঘদিন যাবত ব্যবসা সহায়ক পরিস্থিতির অভাবে শিল্পখাতে উৎপাদন যথাযথ ভাবে সম্পন্ন হচ্ছে না, ফলে শিল্পের বকেয়া ঋণ ক্রমাগত বাড়ছে, যা কোনভাবেই কাম্য নয় বলে জানান তাসকীন আহমেদ। সামগ্রিক অবস্থা উত্তরণে ব্যাংকখাতের গভীরে থাকা কাঠামোগত দূর্বলতার সংষ্কার, ব্যাংক ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আনয়ন ও সুশাসনের উপর প্রধান্য প্রদান এবং রপ্তানিমুখী শিল্পের উপর অতিরিক্ত প্রাধান্য না দিয়ে স্থানীয় শিল্পায়নে অর্থায়ন নিশ্চিতকরণের সুপারিশ করেন ঢাকা চেম্বার সভাপতি।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা প্রফেসর ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, সিএমএসএমই খাতের উন্নয়ন মানেই দেশের উন্নয়ন, তাই এখাতের সামগ্রিক অগ্রগতির জন্য ঢাকা চেম্বার এবং সরকার একযোগে কাজ করতে পারে। তিনি একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক কাঠমো তৈরির উপর জোরারোপ করেন। বাংলাদেশের বাস্তবতায় ব্যাংক কোম্পানী আইনসহ আর্থিকখাতের অন্যান্য আইনের সংষ্কার কোন বিকল্প নেই বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। তিনি জানান, শ্রমঘন শিল্প, যার মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব, সেগুলোর উন্নয়নে বর্তমান সরকার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এছাড়াও ইতোমধ্যে বন্ধ হওয়া শিল্প-কারখানাগুলো চালুর পাশাপাশি অন্যান্য শিল্পখাতে উৎপাদন বাড়ানো এবং নারী উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানে সরকারের পক্ষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে বলে তিনি অভিহত করেন।

তিনি জানান, বর্তমান সরকার যেহেতু বিপুল জনরায় নিয়ে সরকার পরিচালনায় এসেছে, তাই বৈশ্বিক সংকটের অভিঘাতের কারণে দেশে মানুষের জীবনযাত্রায় যেন কষ্ট লাঘব হয়, সেই বিষয়টিকে বেশি হারে প্রাধান্য দিচ্ছে, যার কারণে জ্বালানি তেলের মূল্য এখনও বৃদ্ধি করা হয়নি। উপদেষ্টা আরো বলেন, দেশের আর্থিক খাতের দুরাবস্থার বিষয়ে আমরা সকলেই অবগত রয়েছি, তবে এ অবস্থা উত্তরণে সরকার প্রয়োজনীয় নীতি প্রণয়ন, সংষ্কার সহ অন্যান্য উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। দীর্ঘমেয়াদী টেকসই ঋণ ব্যবস্থা প্রতর্বনের জন্য একটি শক্তিশালী বন্ড মার্কেট ও পুঁজিবাজারের কোন বিকল্প নেই মত প্রকাশ করেন।

অনুষ্ঠানের নির্ধারিত আলোচনায় বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)-এর চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক (গবেষণা) মো. আব্দুল ওয়াহাব, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক (এসএমই ও স্পেশাল প্রোগ্রামস বিভাগ) নওশাদ মোস্তফা এবং পরিচালক (গবেষণা) সেলিম আল মামুন, এনসিসি ব্যাংক পিএলসি-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম. শামসুল আরেফিন এবং সিটি ব্যাংক পিএলসি-এর উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশানুর রহমান প্রমুখ অংশ গ্রহণ করেন|

বিএবি-এর চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার বলেন, এসএমই ফাইন্যান্সিং সহজীকরণ করার কোন বিকল্প নেই এবং বেসরকারি ব্যাংকগুলো এখাতে অর্থায়নে এগিয়ে এসেছে। এছাড়াও সরকারের নীতি নির্ধারক সহ সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সমন্বয়ের অভাব রয়েছে, যার নিরসন প্রয়োজন বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক (এসএমই ও স্পেশাল প্রোগ্রামস বিভাগ) নওশাদ মোস্তফা বলেন, আর্থিক খাতে আমাদের প্রকৃত তথ্যের প্রচুর ঘাটতি রয়েছে, ফলে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। সরকারী সংস্থাসহ আর্থিক খাতের সকল প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক যোগাযোগ বাড়ানোর উপর তিনি জোরারোপ করেন|

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালক (গবেষণা) সেলিম আল মামুন বলেন, অতিরিক্ত তারল্য থাকা সত্ত্বেও ম্যাক্রো ইকোনোমিক স্ট্যাবিলিটি না থাকার কারণে বেসরকারিখাতে চাঞ্চল্য পরিলক্ষিত হচ্ছে না, এজন্য ব্যবসা পরিচালনা সূচকে উন্নয়নের উপর জোরারোপ করেন| মূল্যস্ফীতিকে ৭ শতাংশের কাছাকাছি রাখার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে বলে তিনি অভহিত করেন|

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক (গবেষণা) মো. আব্দুল ওয়াহাব বলেন, ঋণ পরিশোধে উদ্যোক্তাদের সময়সীমা রক্ষা না করার কারণে ব্যাংক ও উদ্যোক্তাদের সম্পর্কটা নিম্নমুখী হচ্ছে, তাই এ সম্পর্কের উন্নয়নের কোন বিকল্প নেই। অর্থায়নের তিনি বেসরকারিখাতকে শুধুমাত্র ব্যাংকের উপর নির্ভর না করে বিকল্প অর্থায়ন যেমন: বন্ড মার্কেট সহ অন্যান্য খাতের উপর নির্ভরশীলতা বাড়ানোর উপর জোরারোপ করেন|

এনসিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম. শামসুল আরেফিন বলেন, বর্তমানে পরিবেশবান্ধব গ্রীণ প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়টিকে ব্যাংকগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে, এক্ষেত্রে উদ্যোক্তারা এধরনের ব্যবসায় এগিয়ে আসতে হবে| এসএসমই খাতের উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক তথ্য সংরক্ষণের ঘাটতির কারণে তাদের ঋণ প্রদান বাধাগ্রস্থ হচ্ছে বলে তিনি অভিমত জ্ঞাপন করেন|

সিটি ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশানুর রহমান জানান, আগামী বছর হতে আইএফআরএস বাস্তবায়ন করা হবে, এর ফলে ব্যাংক খাতে ঋণের অতিরিক্ত প্রভিশন রাখার সুযোগ কমবে, ফলে বাড়বে খেলাপী ঋণ, সেই সাথে কমবে ব্যাংকের সক্ষমতা| তিনি জানান, এসএমইদের সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না, এখাতের উদ্যোক্তাদের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক প্রদত্ত ক্রেডিট গ্যারিন্টি স্কীমের সীমা বাড়ানো এবং ঋণ প্রাপ্তির প্রয়োজনীয় তথ্যাদির সংখ্যা সীমিতকরণ জরুরী| এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য একটি মার্কেট প্লেস খুবই আবশ্যক বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটা না হলে উদ্যোক্তারা নিজেদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে পারবেন না এবং ব্যাংকগুলোর ঋণ প্রদানের প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্থ হবে|

মুক্ত আলোচনায় ঢাকা চেম্বারের প্রাক্তন পরিচালক মো. সারফুদ্দিন এবং এফবিসিসিআই’র সদস্য তানভীর মোহাম্মদ দিপু অংশগ্রহণ করেন। এ সময় তারা সরকারকে ব্যাংক খাত হতে ঋণ নেওয়ার প্রবনতা হ্রাসের উপর জোরারোপ করেন।

ডিসিসিআই সহ-সভাপতি মো. সালিম সোলায়মান এবং পরিচালনা পর্ষদের সদস্যবৃন্দসহ সরকারী সংস্থা ও বেসরকারিখাতের প্রতিনিধিবৃন্দ এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন