

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


আন্তর্জাতিক বাজারে ফেরাস স্ক্র্যাপের মূল্য বাড়তে শুরু করায় বাংলাদেশের এমএস বার বা রডের বাজারেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দিচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট মিল মালিক ও ব্যবসায়ীদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে আমদানি করা স্ক্র্যাপের পুনরায় আমদানির ব্যয় (রিপ্লেসমেন্ট কস্ট) উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় দেশীয় বাজারে দাম সমন্বয়ের চাপ তৈরি হয়েছে।
বাজার পর্যবেক্ষকদের ধারণা, গত কয়েক সপ্তাহে বৈশ্বিক স্ক্র্যাপ বাজারে টনপ্রতি দাম প্রায় ২০ থেকে ৩০ ডলার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে বিশ্বের অন্যতম প্রধান স্ক্র্যাপ আমদানিকারক দেশ তুরস্কের নতুন করে বড় আকারে কেনাকাটা শুরু করা। পাশাপাশি শীতকালীন আবহাওয়ার কারণে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় স্ক্র্যাপ সংগ্রহ ও সরবরাহ ব্যাহত হওয়াও দামের ওপর প্রভাব ফেলছে।
বিশ্ব স্ক্র্যাপ বাণিজ্যে তুরস্ককে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক বা বেঞ্চমার্ক হিসেবে ধরা হয়। সমুদ্রপথে স্ক্র্যাপ আমদানির বড় কেন্দ্র হওয়ায় দেশটির মিলগুলো যখন নিয়মিত কার্গো বুকিং শুরু করে, তখন বৈশ্বিক বাজারে স্ক্র্যাপের প্রাপ্যতা কমে যায়। এতে অন্যান্য আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য প্রতিযোগিতা বাড়ে এবং দাম ঊর্ধ্বমুখী হয় বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
স্ক্র্যাপ কোনো খনিজ সম্পদ নয়; এটি মূলত সংগ্রহনির্ভর। শীত মৌসুমে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় স্ক্র্যাপ সংগ্রহ, পরিবহন এবং বন্দর কার্যক্রম ধীরগতির হয়ে পড়ে। ফলে বাজারে তাৎক্ষণিক সরবরাহ কমে যায় এবং বিক্রেতারা তুলনামূলক বেশি দামে অফার দেন। এই মৌসুমি সংকট আন্তর্জাতিক দামে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
দক্ষিণ এশিয়ার বাজারে ভারতের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, ভারত যখন স্ক্র্যাপ আমদানিতে সক্রিয় হয়, তখন একই উৎস থেকে স্ক্র্যাপ সংগ্রহে বাংলাদেশসহ অন্য দেশগুলোর প্রতিযোগিতা বেড়ে যায়। এতে সরবরাহ সংকুচিত হয় এবং দাম আরও বাড়ে।
এই বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাব দেশীয় বাজারেও পড়তে শুরু করেছে। ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, ইতোমধ্যে কিছু মিল ও ডিলার পর্যায়ে রডের দাম টনপ্রতি সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। মিলগুলোর যুক্তি হলো—উচ্চ দামে কাঁচামাল আমদানি করলে আগের কম দামে বিক্রি দীর্ঘদিন ধরে রাখা সম্ভব নয়, কারণ এতে উৎপাদন খরচ উঠে আসে না।
বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএমএ) সাবেক সভাপতি ও আনোয়ার গ্রুপের চেয়ারম্যান মানওয়ার হোসাইন বলেন, মহামারির পর স্টিল শিল্প সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়া খাতগুলোর একটি। দীর্ঘ সময় লোকসানে পরিচালনার ফলে ব্যাপক মূলধন ক্ষয় হয়েছে এবং অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।
তার মতে, বর্তমান দাম সমন্বয় শুধু আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিক্রিয়া নয়; বরং দীর্ঘদিন খরচের নিচে দামে পণ্য বিক্রির পর এটি একটি স্বাভাবিক বাজারগত সংশোধন।
বিএসএমএর সেক্রেটারি জেনারেল সুমন চৌধুরীও একই মত প্রকাশ করে বলেন, নির্মাণ খাতে দীর্ঘস্থায়ী মন্দা সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি জানান, নির্মাণ খাতের সঙ্গে প্রায় ৩ হাজার ৬০০ শিল্প সরাসরি যুক্ত, ফলে এই খাত দুর্বল হলে তার প্রভাব বহুমুখী হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দিনে বাজার বুঝতে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হবে— ১. তুরস্কের স্ক্র্যাপ আমদানির গতি ২. ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে শীতকালীন স্ক্র্যাপ সংগ্রহের পরিস্থিতি ৩. বাংলাদেশে কাঁচামালের রিপ্লেসমেন্ট কস্ট ও উৎপাদন ব্যয়
সার্বিকভাবে বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক স্ক্র্যাপের দামে ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে খরচের নিচে থাকা রডের বাজার একই অবস্থায় স্থির থাকবে না। বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বাজারে ধীরে ধীরে দাম সমন্বয় হওয়াই স্বাভাবিক।
মন্তব্য করুন

