শনিবার
২৯ আগস্ট ২০২৬, ১৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শনিবার
২৯ আগস্ট ২০২৬, ১৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৫০০ টাকা মজুরির দাবিতে অনড় চা শ্রমিকরা, টানা আট দিন কর্মবিরতি

মাধবপুর (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি:
প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৯:১৮ এএম
ছবি: সংগৃহীত
expand
ছবি: সংগৃহীত

দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা করার দাবিতে আন্দোলনে অনড় রয়েছেন হবিগঞ্জের মাধবপুর ও চুনারুঘাট উপজেলার চা শ্রমিকরা। দাবি আদায়ে টানা আট দিন ধরে প্রতিদিন দুই ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালন করছেন তারা। চুনারুঘাট উপজেলার ১৮টি চা বাগানসহ বিভিন্ন বাগানে এ কর্মসূচি চলছে।

শ্রমিকদের দাবি, বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে ১৮৭ টাকা দৈনিক মজুরি কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে এই মজুরিতে পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা নির্ধারণের দাবি জানাচ্ছেন তারা।

শ্রমিকরা জানান, ২০২২ সালে ধারাবাহিক আন্দোলনের পর তাদের দৈনিক মজুরি ৫০ টাকা বাড়িয়ে ১৮৭ টাকা করা হয়। সম্প্রতি মালিকপক্ষ আরও ৫ শতাংশ মজুরি বাড়ানোর প্রস্তাব দিলেও তা প্রত্যাখ্যান করেছেন শ্রমিকরা। তাদের দাবি, সামান্য শতাংশ বাড়িয়ে বর্তমান সংকটের সমাধান হবে না; প্রয়োজন বাস্তবসম্মত মজুরি নির্ধারণ।

চুনারুঘাটের চান্দপুর চা বাগানের শ্রমিক নেত্রী খাইরুন আক্তার বলেন, যুগের পর যুগ চা শ্রমিকরা রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে বাগানে কঠোর পরিশ্রম করে আসছেন। অথচ তাদের দৈনিক মজুরি মাত্র ১৮৭ টাকা। বর্তমান বাজারদরে এই অর্থ দিয়ে একটি পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব নয়।

তিনি আরও বলেন, চা শ্রমিকদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন, নিরাপদ পানি ও চিকিৎসাসেবার মতো মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করার কথা থাকলেও অনেক বাগানে এসব সুবিধা পর্যাপ্ত নয়। ফলে শ্রমিকদের জীবনযাপন দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। ন্যায্য দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানান তিনি।

চান্দপুর চা বাগানে খাইরুন আক্তারের সঙ্গে গীতা রানি কানু, মোহন রবিদাসসহ ছাত্র, যুবক ও সাধারণ শ্রমিকরা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

অন্যদিকে, শ্রমিকদের দাবির বিষয়ে চা বাগান মালিকপক্ষ বলছে, বর্তমানে চা শিল্প নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অনেক বাগান প্রতিবছর লোকসান করছে। এক কেজি চা উৎপাদনে ২০০ থেকে ৩০০ টাকার বেশি ব্যয় হলেও উৎপাদন খরচের তুলনায় চায়ের বাজারমূল্য বাড়েনি। এর সঙ্গে গ্যাস, বিদ্যুৎ, সার, কীটনাশক, পরিবহন ও যন্ত্রপাতির ব্যয়ও বেড়েছে।

বৈকুণ্ঠপুর চা বাগানের শামসুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, তাদের বাগানে প্রতিবছর লোকসান হচ্ছে এবং ব্যাংক ঋণের পরিমাণও বাড়ছে। উৎপাদিত চায়ের কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় বাগান পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে।

নোয়াপাড়া চা বাগানের ম্যানেজার সোহাগ মাহমুদ বলেন, অর্থসংকটের কারণে তাদের কারখানা প্রায় দুই বছর বন্ধ ছিল। বর্তমানে কারখানা চালু হলেও পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। ব্যাংক ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রেও সমস্যা রয়েছে। এর পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহের সংকটে নিয়মিত লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরি বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় চা শ্রমিকদের দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরির দাবি যৌক্তিক। শ্রমিকরা প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও কঠোর পরিশ্রম করেন। অথচ সেই শ্রমের তুলনায় তাদের মজুরি অত্যন্ত কম। বর্তমান বাজারদর বিবেচনায় নিয়ে শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

শ্রমিক নেতারা জানিয়েছেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কর্মবিরতিসহ বিভিন্ন কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান না হলে আগামী দিনে আন্দোলন আরও জোরালো করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন