

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


কক্সবাজারের রামু উপজেলার খুনিয়াপালং ইউনিয়নে গভীর রাতে দুই যুবককে তুলে নিয়ে গিয়ে বনবিভাগের একটি বিট অফিসে সারারাত আটকে রেখে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, অস্ত্রের মুখে মামলা দেওয়ার ভয় দেখিয়ে জনপ্রতি ৮ হাজার টাকা নেওয়ার পর পরদিন সকালে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ২৫ মার্চ দিবাগত রাত আনুমানিক ২টার দিকে থোয়াইংগাকাটা বাজারের একটি চায়ের দোকানে বসে ছিলেন হাতির ডেবা এলাকার বাসিন্দা প্রতিবন্ধী বাবুল এবং রমজান আলী। এ সময় কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগের রাজারকুল রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা অভিউজ্জমান ও আপাররেজু বিট কর্মকর্তা আল ফুয়াদ একটি সরকারি গাড়িতে করে সেখানে আসেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, কোনো ধরনের কাগজপত্র বা গ্রেপ্তারি কারণ না দেখিয়েই অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ওই দুই যুবককে জোরপূর্বক গাড়িতে তুলে নেওয়া হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল হক, সাইদুর রহমান ও আবদুর রশিদসহ একাধিক ব্যক্তি বলেন, বনবিভাগের লোকজন খুব দ্রুত এসে দুজনকে তুলে নিয়ে যান। কেন নেওয়া হচ্ছে, তা কেউ জানতে পারেননি। পরে শোনা যায়, টাকা দিয়ে তারা ছাড়া পেয়েছেন।
ভুক্তভোগী রমজান আলী বলেন, আমরা চায়ের দোকানে বসে কথা বলছিলাম। হঠাৎ করে তারা এসে আমাদের যেতে বলে। আমরা কারণ জানতে চাইলে অস্ত্র দেখিয়ে জোর করে তুলে নেয়। পরে একটি জরাজীর্ণ কক্ষে সারারাত আটকে রাখা হয়। সকালে জনপ্রতি ৮ হাজার টাকা দেওয়ার পর আমাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
অন্য ভুক্তভোগী বাবুল শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী। তার পরিবারের সদস্যরা জানান, ঘটনার পর তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন এবং আতঙ্কে রয়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। পাহাড় কাটা, বালু উত্তোলন এবং বনভূমিতে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে অর্থের বিনিময়ে ছাড় দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা বলেন, টাকা দিলে অনেক অবৈধ কর্মকাণ্ডও ‘ব্যবস্থাপনার’ মাধ্যমে চলতে পারে, আর টাকা না দিলে উল্টো হয়রানির শিকার হতে হয়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১৪ জানুয়ারি রাতে রাজারকুল ও উখিয়া রেঞ্জের যৌথ অভিযানে থোয়াইংগাকাটা এলাকায় একটি ডাম্পার জব্দ করা হয়েছিল। স্থানীয়দের দাবি, সেটি পরে বিপুল অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে এ বিষয়ে কোনো লিখিত নথি পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ রয়েছে, বিট কর্মকর্তা আল ফুয়াদ ও রেঞ্জ কর্মকর্তা অভিউজ্জামান কার্যত পুরো এলাকায় এক ধরনের অঘোষিত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন, যা স্থানীয়দের ভাষায় ‘আতঙ্কের সাম্রাজ্য’। তাদের বিরুদ্ধে বনের গাছ অবৈধভাবে বিক্রি, লাইসেন্সবিহীন করাতকল থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায়, পাহাড় কাটায় ব্যবহৃত যানবাহন জব্দ করে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া, চুক্তিভিত্তিক ফার্নিচার পাচারে সহায়তা, এমনকি টাকার বিনিময়ে বনভূমি দখল ও বিক্রির সুযোগ করে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, বন সংরক্ষণের দায়িত্বে থাকা এসব কর্মকর্তার আচরণে উল্টো বনই যেন পরিণত হয়েছে ‘লেনদেনের উৎসে’; আইন প্রয়োগের পরিবর্তে তারা অভিযুক্তদের সঙ্গে সমঝোতায় বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, মাঠপর্যায়ের কিছু কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশে গড়ে ওঠা এই চক্রের কারণে বনভূমি যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি সাধারণ মানুষও পড়ছেন হয়রানি ও ভয়ভীতির মধ্যে। ফলে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রমাণভিত্তিক যাচাই এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
অভিযুক্ত বিট কর্মকর্তা আল ফুয়াদ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, বন থেকে গাছ কাটার সময় কয়েকজনকে আটক করা হয়েছিল। তারা পরে ঝামেলা সৃষ্টি করে চলে যায়। এই দু'জন আটক করা হয়েছিলো। পরে তাদের হাজির করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কোনো অর্থ লেনদেন হয়নি।
রেঞ্জ কর্মকর্তা অভিউজ্জমান বলেন, থোয়াইংগাকাটা বাজারটি বনবিভাগের জমিতে অবস্থিত। সন্দেহভাজন কাউকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা যেতে পারে। তবে টাকা নেওয়ার বিষয়টি তার জানা নেই।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ব্যক্তিকে আটক করতে হলে নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। গ্রেপ্তারের পর তা নথিভুক্ত করা, কারণ স্পষ্ট করা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আদালতে হাজির করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এসব প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কাউকে আটক রাখা আইনসম্মত নয়।
কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) আব্দুল্লাহ-আল-মামুন বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। আপনারা তথ্য দেন। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মন্তব্য করুন
