

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা-মা, স্ত্রী আর দুই কন্যাসন্তান। পুরো পরিবারের একমাত্র ভরসা ছিলেন শফিকুল ইসলাম। বিদেশের মাটিতে দিনরাত পরিশ্রম করে যে মানুষটি পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন দেখতেন, সেই মানুষটিই আজ নিথর। লেবাননে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় নিহত হওয়ার খবর পৌঁছানোর পর থেকেই সাতক্ষীরার সদর উপজেলার ভালুকা চাঁদপুর গ্রামের ছোট্ট সেই বাড়িটিতে নেমে এসেছে শোক আর অনিশ্চয়তার কালো ছায়া।
নিহত শফিকুল ইসলাম (৪০) ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার উপার্জনের টাকাতেই চলত বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ওষুধ, দুই মেয়ের লেখাপড়া এবং পুরো সংসারের খরচ। এখন পরিবারের সদস্যদের চোখে শুধু আতঙ্ক, কিভাবে চলবে আগামী দিনের জীবন।
সোমবার (১১ মে) লেবাননের নাবাতিহ জেলার জেবদিন এলাকায় ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় নিহত হন শফিকুল। বাংলাদেশ দূতাবাস, বৈরুত তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। হামলার সময় তিনি নিজ আবাসস্থলে ছিলেন বলে জানা গেছে।
১৮ বছর আগে আশাশুনি উপজেলার কুল্যা ইউনিয়নের কচুয়া গ্রামের রুমা খাতুনকে বিয়ে করেন শফিকুল। সুখ-দুঃখের সেই সংসারে জন্ম নেয় দুই কন্যাসন্তান। বড় মেয়ে মৌ আক্তার বর্তমানে চাঁদপুর ডিগ্রি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে পড়ছে। ছোট মেয়ে বৃষ্টি আক্তার অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী, পড়াশোনা করছে চাঁদপুর কাওছারীয়া দাখিল মাদরাসায়।
স্বপ্ন ছিল মেয়েদের উচ্চশিক্ষিত করবেন। পরিবারের অভাব দূর করবেন। সেই স্বপ্ন নিয়েই মাত্র ২ মাস আগে পাড়ি জমান লেবাননে। কষ্টের জীবন কাটালেও পরিবারের জন্য নিয়মিত টাকা পাঠাতেন তিনি। সেই টাকাতেই কোনো রকমে টিকে ছিল পরিবারটি।
শফিকুলের মৃত্যুর খবর শুনে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন স্ত্রী রুমা খাতুন। কখনো স্বামীর ছবি জড়িয়ে ধরে নির্বাক হয়ে বসে থাকছেন, আবার কখনো দুই মেয়েকে বুকে জড়িয়ে আহাজারি করছেন। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের অবস্থাও একই। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে যেন দিশেহারা পুরো পরিবার।
প্রতিবেশী জিয়াউর রহমান জানান, শফিকুল ছিলেন অত্যন্ত পরিশ্রমী ও শান্ত স্বভাবের মানুষ। পরিবারের সুখের জন্য নিজের জীবনকে কষ্টের মধ্যে রেখেও কখনো অভিযোগ করেননি। বিদেশে থেকেও পরিবারের খোঁজখবর নিতেন নিয়মিত।
শফিকুলের মা আজেয়া খাতুন বলেন, আমার ছেলে সংসারের একমাত্র ভরসা ছিল। বিদেশে থেকে কষ্ট করে আমাদের জন্য টাকা পাঠাতো। এখন আমার ছেলে আর বেঁচে নেই, আমরা একেবারে অসহায় হয়ে পড়েছি। সরকারের কাছে আমাদের একটাই অনুরোধ, যেন দ্রুত সরকারি খরচে আমার ছেলের মরদেহ দেশে এনে আমাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। অন্তত শেষবারের মতো যেন ছেলেকে দেখতে পারি।
সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বিষ্ণুপদ পাল বলেন, জেলার সদর ও আশাশুনি উপজেলার দুই রেমিট্যান্স যোদ্ধা শফিকুল ইসলাম ও নাহিদুল ইসলাম ইসরাইলি বিমান হামলায় নিহত হওয়ায় আমরা গভীরভাবে শোকাহত। তাদের আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করছি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।
তিনি আরও বলেন, ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট দুই উপজেলার ইউএনওদের সরেজমিনে গিয়ে পরিবারের খোঁজখবর নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারের পাশে থেকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করা হবে বলেও জানান তিনি।
এর আগে, সোমবার (১১ মে) লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলের ড্রোন হামলায় নিহত হয় সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ভালুকা চাঁদপুর গ্রামের শফিকুল ইসলাম (৪০) এবং আশাশুনি উপজেলার কাদাকাটি গ্রামের মো. নাহিদুল ইসলাম (২০)।
পরে বাংলাদেশ দূতাবাস, বৈরুত এক শোকবার্তায় নিহত দুই বাংলাদেশির নাম ও পরিচয় নিশ্চিত করে। শোকবার্তায় জানানো হয়, দুপুর প্রায় ১২টার দিকে নিজ আবাসস্থলে অবস্থানকালে ইসরায়েলি এয়ার স্ট্রাইকে নিহত হন তারা।