মঙ্গলবার
২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১৫ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মঙ্গলবার
২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১৫ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আজমিরীগঞ্জে অবৈধভাবে ইউরোপ পাঠানোর ঘটনায় আরও দু’জন গ্রেফতার

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ : ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ১১:১৩ পিএম
আজমিরীগঞ্জে অবৈধভাবে ইউরোপ পাঠানোর ঘটনায় আরও দু’জন গ্রেফতার:
expand
আজমিরীগঞ্জে অবৈধভাবে ইউরোপ পাঠানোর ঘটনায় আরও দু’জন গ্রেফতার:

হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জে অবৈধভাবে সাগরপথে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর নামে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনায় মানবপাচার চক্রের আরও দুই সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব-৯।

গ্রেফতারকৃতরা হলেন, আজমিরীগঞ্জ উপজেলার পশ্চিমবাগ এলাকার রুমান মিয়া (৩৬) ও সোহাগ মিয়া (২৫)।

র‌্যাব-৯, সিপিসি-৩ শায়েস্তাগঞ্জ ক্যাম্প সূত্রে জানা যায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গতকাল রাতে শায়েস্তাগঞ্জ থানার অলিপুর রেলক্রসিং এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়। র‌্যাব জানায়, গ্রেফতারকৃতরা দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার সঙ্গে জড়িত ছিল।

এ বিষয়ে গত ১ এপ্রিল এনপিবি নিউজ এ "মানবপাচার নিয়ে আতঙ্ক-উৎকণ্ঠায় হবিগঞ্জবাসী, নিখোঁজ ৪০" একটি শীর্ষ সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল।

এর আগে একই অভিযোগে সাজিদ মিয়া নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। তবে মানবপাচার চক্রের প্রধানসহ অধিকাংশ আসামি এখনো পলাতক রয়েছে বলে জানা গেছে।

তবে প্রধান আসামি হাসান মোল্লা'সহ অন্যান্য আসামিরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাহিরে। ভুক্তভোগীদের পরিবার ও মামলা সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর লিবিয়া থেকে ইতালিগামী নৌকায় করে হবিগঞ্জ জেলার ৩৮ যুবক নিখোঁজ হন। দীর্ঘ সময় পার হলেও এখনো তাদের কোনো সন্ধান মেলেনি। এরই মধ্যে নতুন করে লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে আরও দুই যুবক প্রায় ২৫ দিন ধরে নিখোঁজ রয়েছেন বলে পরিবার সূত্রে জানা গেছে।

নিখোঁজ দুই ব্যক্তি হলেন হবিগঞ্জ সদর উপজেলার সানাবই গ্রামের সিরাজুল ইসলামের ছেলে লুৎফুর রহমান (৪০) এবং লাখাই উপজেলার সিংহগ্রামের বাসিন্দা জুনাইদ মিয়া। তারা দালালের মাধ্যমে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে গত ডিসেম্বর লিবিয়ায় যান। সেখানে প্রায় সাড়ে তিন মাস অবস্থানের পর গত ২১ মার্চ পরিবারকে জানান, সেদিনই নৌকাযোগে গ্রিসের উদ্দেশ্যে রওনা দেবেন। এরপর থেকেই তাদের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

পরিবারের সদস্যরা জানান, দালাল আব্দুস সালামের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি প্রথমে দাবি করেন, তারা গ্রিসে পৌঁছেছেন। তবে নিখোঁজদের পক্ষ থেকে কোনো নিশ্চিত বার্তা না পাওয়ায় সন্দেহ বাড়তে থাকে। পরে সালামের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায় এবং তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে।

এদিকে ২৭ মার্চ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে লিবিয়ার তোবরুক বন্দর থেকে গ্রিসগামী একটি নৌকাডুবির ঘটনায় ২২ জনের মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয়। তাদের মধ্যে ২১ জন বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশী বলে জানা যায়। খাদ্য ও পানির সংকট এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে তারা প্রাণ হারান বলে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পর নিখোঁজদের পরিবারে শোক ও উৎকণ্ঠা আরও বেড়ে যায়।

নিখোঁজ লুৎফুর রহমানের ছোট ভাই সাইফুল ইসলাম বলেন, “প্রায় ২০ লাখ টাকা খরচ করে দালালের মাধ্যমে আমার ভাই ও জুনাইদকে বিদেশে পাঠানো হয়। ২১ মার্চ তারা নৌকায় ওঠার কথা জানায়। এরপর থেকে আর কোনো খোঁজ নেই। আমরা শুধু জানতে চাই তারা বেঁচে আছে, না মারা গেছে।”

সানাবই গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য শাহনেওয়াজ জানান, নিখোঁজদের পরিবারগুলো চরম দুশ্চিন্তার মধ্যে রয়েছে। তিনি বলেন, “লুৎফুর রহমানের বৃদ্ধ পিতা, স্ত্রী ও সন্তানরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। আমরা দ্রুত তাদের সন্ধান এবং দালালদের গ্রেপ্তার দাবি করছি।”

৩৮ জন নিখোঁজের ঘটনায় গত ২১ ডিসেম্বর হবিগঞ্জ সদর থানায় মানবপাচার চক্রের ১২ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, অভিযুক্তরা জনপ্রতি ১৭ থেকে ২০ লাখ টাকা নিয়ে লিবিয়া হয়ে ইতালি পাঠানোর প্রলোভন দেখায়। পরে লিবিয়ার ত্রিপোলি উপকূল থেকে চারটি নৌকা ইতালির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়, যার একটি নৌকায় থাকা হবিগঞ্জের ৩৮ জনসহ প্রায় ৯০ জন নিখোঁজ হয়ে যায়।

মামলার এজাহারভুক্ত আসামিরা হলেন—আব্দুল গণি, সামাউন মোল্লা ওরফে হাসান আশরাফ, রুমান মিয়া, উমান মিয়া, জাহাঙ্গীর আলম ওরফে ছাদক মনি, রিয়াদ চৌধুরী বাপ্পী, আজাদ মিয়া, আব্দুল মুকিত মাস্টার, মুফতি সামায়ুন কবির, সাজিদ মিয়া (গ্রেপ্তার), সুভাষ মিয়া ও ঝর্ণা আক্তার।

পরিবারগুলোর অভিযোগ, মানবপাচার চক্র এখনো সক্রিয় রয়েছে এবং নতুন করে বেকার যুবকদের ইউরোপের স্বপ্ন দেখিয়ে প্রতারণা করছে। অনেকেই জমি বন্ধক ও ঋণ করে সন্তানদের বিদেশে পাঠিয়েছেন, কিন্তু এখন না পাচ্ছেন সন্তানের খোঁজ, না পাচ্ছেন অর্থ ফেরত।

হবিগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দেলোয়ার হোসেন জানান, মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে এবং পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত আছে। তদন্ত কর্মকর্তা এসআই সিরাজুল মৌলা বলেন, ইতোমধ্যে একজন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, বাকিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার রুটটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। দালালরা প্রলোভন দেখিয়ে মানুষকে পাঠালেও বাস্তবে তারা নির্যাতন, অর্থ আদায় ও মৃত্যুঝুঁকির মুখে পড়ছেন। নিখোঁজদের পরিবারের দাবি, দ্রুত তাদের অবস্থান জানাতে হবে এবং মানবপাচার চক্রের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন