

কক্সবাজার আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা এক সাক্ষী। নথিতে যিনি এই মামলার বাদী। শপথ নেওয়ার পর তিনি শান্ত গলায় বলেন, ‘আমি এই মামলা করিনি, এজাহারের স্বাক্ষরও আমার নয়।’ ৩১ মার্চের সেই বক্তব্যে মুহূর্তেই বদলে যায় আদালতকক্ষের আবহ। উপস্থিত সবার চোখে ভেসে ওঠে একের পর এক প্রশ্ন। একটি ইয়াবা মামলার ভিত যেন হঠাৎ করেই নড়ে ওঠে।
মামলাটি শুরু হয়েছিল একেবারেই নিয়মমাফিক পথে। ২০২৩ সালের ৭ সেপ্টেম্বর, টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের পানছড়ি এলাকায় অভিযান চালায় র্যাব-১৫। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখান থেকে দুইজনকে আটক করা হয়; উদ্ধার দেখানো হয় ৬০ হাজার পিস ইয়াবা ও তিনটি মোবাইল ফোন। পরদিন টেকনাফ থানায় মামলা হয়। বাদী হিসেবে নাম আসে র্যাবের তৎকালীন কর্মকর্তা মো. ফিরোজ আহামেদের। এরপর তদন্ত, অভিযোগপত্র, বিচারিক প্রক্রিয়া- সবই এগোয় প্রতিষ্ঠিত নিয়মে।
কাগজে-কলমে মামলাটি ছিল একেবারে ‘স্বাভাবিক’। কিন্তু আদালতে দাঁড়িয়ে বাদীর সেই এক দিনের সাক্ষ্যই যেন প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয় পুরো প্রক্রিয়াকে। মামলার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যা কিছু ঘটেছে, সবকিছুই মুর্হুতে বদলে যায়।
ঘটনার সময় তিনি কক্সবাজারে র্যাবে কর্মরত থাকলেও বর্তমানে বান্দরবান জেলার রুমা উপজেলায় ৯ বিজিবিতে সুবেদার পদে কর্মরত রয়েছেন।
আদালত থেকে পাওয়া তথ্য এবং মামলার নথির ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের পানছড়ি এলাকায় র্যাব-১৫-এর একটি দল অভিযান চালিয়ে দুইজনকে আটক করে। তাদের কাছ থেকে ৩০ হাজার করে মোট ৬০ হাজার পিস ইয়াবা ও তিনটি মোবাইল ফোন উদ্ধার হয়।
অভিযানের পরদিন ৮ সেপ্টেম্বর র্যাবের ওই সময়ের ডিএডি মো. ফিরোজ আহামেদ বাদী হয়ে টেকনাফ থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় দুইজনকে গ্রেপ্তার এবং একজনকে পলাতক আসামি দেখানো হয়।
অভিযোগটি তৎকালীন টেকনাফ থানার ওসি মোহাম্মদ জোবাইর সৈয়দ এবং পরিদর্শক ওসি (তদন্ত) নাছির উদ্দিন মুজমদার যৌথ স্বাক্ষরে মামলা হিসেবে রেকর্ড হয়। (টেকনাফ থানা মামলা নম্বর : ২৩/২০২৩ ইংরেজি এবং জিআর মামলা নম্বর : ৬৪১/২০২৩)।
ইয়াবা মামলাটি তদন্তের জন্য অফিসার ইনচার্জ দায়িত্ব দেন ওই সময়ে টেকনাফ থানায় কর্মরত উপ-পরিদর্শক মোহাম্মদ গোলাম হক্কানীকে। তদন্ত শেষে গোলাম হাক্কানী ১৯ অক্টোবর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অভিযানের সময় গ্রেপ্তারকৃত দুই আসামির সঙ্গে তদন্তপর্যায়ে প্রাপ্ত আরো তিনজনকে দোষী উল্লেখ করে পাঁচজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা।
এরপর ২০২৫ সালের ৬ মে আদালতে মামলাটি অভিযোগ গঠন এবং বিচারের জন্য প্রস্তুত হয়। বিচারিক আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে প্রথমে বাদীকে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য আদালতে তলব করা হয়।
বাদীর এমন চাঞ্চল্যকর দাবির ঘটনা ঘটেছে কক্সবাজারের কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালতের বিচারক মোহাম্মদ নজরুল ইসলামের এজলাসে। সেখানেই ওইদিন সাক্ষ্য দেন র্যাব-১৫-এর সাবেক কর্মকর্তা মো. ফিরোজ আহামেদ।
বাদীর এমন দাবির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ওই আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আবদুর রশিদ। তিনি বলেন, বাদীর এ বক্তব্যে আদালত কক্ষজুড়ে বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি আমলে নিয়ে বিচারক মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম পুরো ঘটনার রহস্য উদঘাটনে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজিকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
তিনি আরো বলেন, সমন পেয়ে মামলার এজাহার দায়েরকারী বাদী কক্সবাজারস্থ র্যাব-১৫-এর সাবেক কর্মকর্তা ফিরোজ গত ৩১ মার্চ কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালতে উপস্থিত হন। তিনি সাক্ষ্য দিতে গিয়ে সাক্ষীর কাঠগড়ায় উঠে শপথ গ্রহণ করে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালতের বিচারক মোহাম্মদ নজরুল ইসলামকে বলেন, তিনি এ মামলার নন। এই মামলা সম্পর্কে তিনি কিছুই জানি না, এজাহারকারী হিসেবে তার নাম থাকলেও এজাহারের নিচে থাকা স্বাক্ষর তার নয়। একইভাবে মামলার আসামিদের তিনি চিনেন না বলে আদালতকে জানান।
আদালতে বক্তব্য দেওয়ার পর বাদী মো. ফিরোজ আহাম্মেদ তার বক্তব্য স্বহস্তে লিখে হলফনামা আকারে আদালতে দাখিল করেন। হলফনামায় বাদী মো. ফিরোজ আহাম্মেদের নমুনা স্বাক্ষরও নেওয়া হয়। হলফনামাটি একই আদালতের অতিরিক্ত পিপি অ্যাডভোকেট তারেক আজিজ সত্যায়িত করেন।
বাদী যখন আদালতে এমন বক্তব্য দিচ্ছিলেন তখন ওই মামলার আসামি আসামি মো. আব্দুল্লাহ ও মো. আলী আদালতে উপস্থিত ছিলেন। ওই সময় আসামিদের মুখে হাসি দেখা গেছে। কারণ, বাদী যদি মামলার বিষয়টি অস্বীকার করেন, তাহলে মামলার দায় থেকে তারা খালাস পেতে পারেন-এমন আশা আসামীদের।
বাদীর সাক্ষ্যগ্রহণের পর বিচারক আদেশে বলেন, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি মামলায় এজাহারকারী সঠিকভাবে শনাক্ত না হওয়া একটি মারাত্মক ত্রুটি। মামলাটি কীভাবে দায়ের হলো, কারা এজাহার করেছে, স্বাক্ষর জাল কিনা, তদন্ত প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়েছে কিনা—এসব বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুসন্ধান করা জরুরি।
বিচারক আরও উল্লেখ করেন, প্রকৃত অপরাধীরা পার পেয়ে গেছে কিনা বা নিরীহ কাউকে ফাঁসানো হয়েছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
আদালতের আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদমর্যাদার নিচে নন -এমন একজন কর্মকর্তার মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা তদন্ত করে এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে। একইসঙ্গে আদেশের কপি পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বরাবর পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাদীর ভাষ্য শুনে কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. আব্দুল মান্নান বলেন, ‘বিষয়টি খুবই বিস্ময়কর। একটি বাহিনীর পক্ষে মামলার এজহার দাখিল, পুলিশ কর্মকর্তাদের স্বাক্ষরে মামলা রেকর্ড এবং তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলের পর এমন প্রশ্ন উত্থাপনের সুযোগ নেই।’
তিনি বলেন, ‘মামলার তদন্ত পর্যায়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা বাদীকে শনাক্ত করার কথা। আর এখন যদি বাদী আদালতে অস্বীকার করেন তাহলে বুঝতে হবে মামলাটি দায়েরের সময় জালিয়াতি হয়েছে। এক্ষেত্রে মামলা লিপিবদ্ধ করার সময় থানার ওসিসহ সংশ্লিষ্টরা যাচাই-বাছাই না করে অপরাধ করেছেন। তদন্তকারী কর্মকর্তা তদন্তকালে বাদীকে শনাক্ত না করে আরও একটি অপরাধ করেছেন। তাই সংশ্লিষ্ট সবার বিরুদ্ধে তদন্ত পূর্বক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।’
মামলা রেকর্ড এবং তদন্ত পর্যায়ে বাদীকে শনাক্ত না করার বিষয়ে জানতে চেয়ে ফোন করা হয় টেকনাফ থানার তৎকালীন অফিসার ইনচার্জ এবং মামলা রেকর্ডকারী পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ জোবাইর সৈয়দকে।
কিন্তু অপরপ্রান্ত থেকে তিনি সাড়া না দেওয়ায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। একইভাবে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক মোহাম্মদ গোলাম হক্কানী বর্তমানে কক্সবাজার জেলায় কর্মরত নেই। ফলে তার বক্তব্য জানাও সম্ভব হয়নি।
মন্তব্য করুন