


মুসলমানের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন- শুক্রবার। এ দিনকে হাদিসে মুসলমানের সপ্তাহিক উৎসবের দিন বলা হয়েছে। অন্য হাদিসে এ দিনকে উল্লেখ করা হয়েছে আল্লাহর কাছে শ্রেষ্ঠ ও সম্মানিত হিসেবে। (ইবনে মাজাহ: ১০৮৪) বৃহস্পতিবার দিবসের আলো ফুরাতেই শুরু হয় শুক্রবার।
তাই বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতই হলো জুমার রাত। এ রাত ও রাত পরবর্তী দিনকে রাসুল সা. বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। সাহাবিদের নির্দেশ দিতেন এ সময়টায় ইবাদতে নিমগ্ন থাকতে।
এখানে এনপিবির পাঠকদের জন্য জুমার রাত-দিনের কিছু আমল তুলে ধরা হলো।
কোরআন তেলাওয়াত কোরআন তেলাওয়াতের গুরুত্ব ও ফজিলত নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। আল্লাহর নিকট অত্যন্ত পছন্দের ইবাদত এটি। জুমার দিন শুরু হতেই- সাহাবায়ে কেরাম কোরআন তেলাওয়াতে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। হাদিসে এসেছে ‘যে ব্যক্তি কোরআন থেকে একটি অক্ষর পড়ে, তার জন্য একটি নেকি লেখা হয়। আর একটি নেকি দশ গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। আমি বলি না যে 'আলিফ-লাম-মীম' একটি অক্ষর; বরং 'আলিফ' একটি অক্ষর, 'লাম' একটি অক্ষর এবং 'মীম' একটি অক্ষর। (জামে তিরমিজি: ২৯১০ )
সুরা কাহাফ পাঠ জুমা দিনের বিশেষ ইবাদতগুলোর একটি হলো- সুরা কাহাফ তেলাওয়াত। একাধিক হাদিসে এর ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে। এক হাদিসে বলা হয়েছে- যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা আল-কাহফ তিলাওয়াত করবে, তার জন্য এ জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত একটি নূর (আলো) প্রকাশিত হবে।‘(আস-সুনানুল কুবরা, হাদিস: ৬০৬; আল-মুস্তাদরাক, হাদিস: ৩৩৯২)
অন্য এক হাদিসে এসেছে- ‘যে ব্যক্তি সূরা আল-কাহফের শেষ দশটি আয়াত মুখস্থ রাখবে, সে দাজ্জালের ফিতনা থেকে নিরাপদ থাকবে।’ (সহিহ মুসলিম: ৮০৯)
দরুদপাঠ জুমার রাত ও দিনে দরুদ পাঠ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। রাসুল সা. তার হাদিসে পষ্টভাবে জুমার রাত-দিনে দরুদপাঠের কথা বলেছেন। রাসুল বলেছেন- ‘তোমাদের সর্বোত্তম দিন হলো জুমার দিন। সুতরাং এ দিনে (এবং এর রাতসহ) আমার ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করো। তোমাদের দরুদ আমার কাছে পৌঁছানো হয়।’ (সুনানে আবু দাউদ: ১০৪৭)
দোয়া ও মোনাজাত দোয়া মুমিনের সর্বক্ষণের ইবাদত। তথাপি জুমার দিন ও রাত হলো দোয়া কবুলের সময়। তাই মুমিন মাত্রই উচিত এদিন এলে আল্লাহর কাছে বেশি বেশি মোনাজাত করে নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো চেয়ে নেয়া। বিশেষ করে জুমার শেষ রাতে, জুমার খোতবার সময় এবং এদিন আসরের পর থেকে মাগরিবের মধ্যবর্তী সময়ে।
দোয়া ও মোনাজাতের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তোমরা আমাকে ডাকো আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিব।’ (সুরা মুমিন: ৬০)
রাসুল সা. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে দোয়া করে না, আল্লাহ তার ওপর অসন্তুষ্ট হন। (জামে তিরমিজি: ৩৩৭৩)
তাওবা ও ইস্তেগফার পাঠ দোয়ার পাশাপাশি আল্লাহর কাছে মাগফিরাত কামনা করাও মুমিনের একান্ত কর্তব্য ও জরুরি বিষয়। কেননা এদিন আল্লাহ তার অসংখ্য বান্দার পাপ মার্জনা করেন। আল্লাহ তাআলা সরাসরি এর নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর। অতঃপর তাঁর কাছে ফিরে আস। নিশ্চয়ই আমার রব অতি দয়ালু ও অধিক মমতাময়।’(সুরা হুদ: ৯০)
রাসুল সা. বলেছেন, `যে ব্যক্তি বেশি বেশি ইস্তিগফার করবে আল্লাহ তাআলা তার সকল সংকট থেকে উত্তরণের ব্যবস্থা করে দেন, তার সকল পেরেশানী দূর করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিযিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।’ (সুনানে আবু দাউদ: ১৫১৮)
তাহাজ্জুদ জুমার রাতে তাহাজ্জুদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। আল্লাহ তাআলা স্বয়ং রাসুল সা.কে তাহাজ্জুদের নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, আর রাত্রির কিছু অংশে তাহাজ্জুদ পড়, ওটা তোমার জন্য নফল, শীঘ্রই তোমার প্রতিপালক তোমাকে প্রশংসিত স্থানে উন্নীত করবেন। (সুরা আল-ইসরা, ৭৯)
রাসুল সা. বলেছেন, ‘ফরজ নামাজের পর সর্বোত্তম নামাজ হলো রাতের নামাজ (তাহাজ্জুদ)।’ (সহিহ মুসলিম: ১১৬৩)
অন্য হাদিসে তাহাজ্জুদ আদায়কারীদের সুসংবাদ দিয়ে বলা হয়েছে, ‘জান্নাতে এমন কিছু কক্ষ রয়েছে, যার ভেতর থেকে বাইরে এবং বাইরে থেকে ভেতর দেখা যায়। আল্লাহ সেগুলো প্রস্তুত করেছেন তাদের জন্য, যারা মানুষকে খাবার খাওয়ায়, কোমল ভাষায় কথা বলে, নিয়মিত রোজা রাখে এবং মানুষ ঘুমিয়ে থাকাকালে রাতে নামাজ পড়ে।’ (জামে তিরমিজি: ১৯৮৪)
জিকির-আজকার জিকির হলো আল্লাহর স্মরণ। অন্তরের পরিশোধক এবং আত্মার প্রশান্তি। বান্দার অন্তরে গোনাহের ময়লা জমে গেলে, তা দূর করার পদ্ধতি হলো অধিক পরিমাণে আল্লাহ জিকির। জিকিরের বেলায় আল্লাহ বলেছেন ‘অতএব, তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করব।’ (সুরা আল-বাকারা, ১৫২)
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেছেন যারা ঈমান এনেছে, তাদের অন্তর আল্লাহর জিকির দ্বারা প্রশান্ত হয়। জেনে রাখো, আল্লাহর জিকির দ্বারাই অন্তর প্রশান্ত হয়।’ (সুরা আর-রাদ, ২৮)
রাসুল সা. বলেন, আল্লাহর কিছু ফেরেশতা পৃথিবীতে ঘুরে বেড়ান। তারা জিকিরের মজলিস খুঁজে বেড়ান। যখন তারা কোনো জিকিরের মজলিস পান, তখন তারা সেখানে বসে যান এবং তাদের ডানা দিয়ে সেই মজলিসকে আচ্ছাদিত করেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৪০৮; সহিহ মুসলিম: ২৬৮৯)
এছাড়া যে কোনো নফল ইবাদতই করা যেতে পারে জুমার রাত ও দিনে। আলোচিত নিবন্ধে বিশেষ কিছু আমলের কথা বলা হয়েছে।