বুধবার
১১ মার্চ ২০২৬, ২৭ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
বুধবার
১১ মার্চ ২০২৬, ২৭ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সৌদি আরবের ২০ রমজান, ঐতিহাসিক মক্কা বিজয়ের দিন আজ

মো. কামাল উদ্দিন, এনপিবি নিউজ, সৌদি আরব প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১০ মার্চ ২০২৬, ১০:৩৬ পিএম
মক্কা
expand
মক্কা

মক্কা বিজয়ের দিন ইতিহাসে শুধু ইসলামের ইতিহাসেই নয়, বিশ্বসভ্যতার ইতিহাসেও অনন্য সাধারণ বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদার অধিকারী। নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরতের অষ্টম বছরে ১০ হাজার মুসলিম সৈন্যের এক বাহিনী নিয়ে মক্কানগরী জয় করেছিলেন এ দিনে।

মহান আল্লাহ মুসলমানদের ঈমানের পরীক্ষা নিয়েছেন। ইসলাম গ্রহণের জন্য এমন কোনো কষ্ট নেই—যা তারা সহ্য করেননি। সবশেষে জন্মভিটাও ছাড়তে বাধ্য করেছিল কাফেররা।

ইতিহাসে মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে মহান আল্লাহ তাঁর দ্বীন ও রাসুলকে শক্তিশালী করেছেন। নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং হারাম মক্কির সম্মান বৃদ্ধি করেছেন। মক্কার এই বিজয়ের মাধ্যমে মহান আল্লাহ তাঁর ঘর ও শহরকে এবং সমগ্র বিশ্ববাসীর হেদায়াতের কেন্দ্রস্থলকে কাফের-মুশরিকদের হাত থেকে মুক্ত করেছেন।

এই বিজয়ে আসমানের অধিবাসীগণ খুশি হয়েছিল এবং এই বিজয়ের ফলেই দলে দলে লোক ইসলামে প্রবেশ করেছিলেন।

অষ্টম হিজরির রমজান মাসের দশ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর নবীজি দশ হাজার মুজাহিদের একটি বাহিনী নিয়ে মক্কার উদ্দেশ্যে বের হলেন। বের হওয়ার সময় আবু রুহম কুলছুম বিন হুসাইনকে মদিনার খলিফা নিযুক্ত করেন।

মক্কা আক্রমণ ও জয় করার কারণ ছিল, কুরাইশরা হুদায়বিয়ার সন্ধি চুক্তি ভঙ্গ করেছিল এবং খুযাআ গোত্রের ওপর রাতের অন্ধকারে আক্রমণ করে তাদেরকে অকাতরে হত্যা করেছিল। হুদায়বিয়ার সন্ধির শর্ত মোতাবেক খুযাআ গোত্র নবীজির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ ছিল। এটি ছিল হুদায়বিয়ার সন্ধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

নবীজি সাহাবিদের নিয়ে মাররুজ-জাহরানে পৌঁছালে রাতে আগুন জ্বালানোর নির্দেশ দেন। আগুনের আলোতে আশপাশের অঞ্চল আলোকিত হয়ে যায়। মক্কাবাসীদের কাছে মুসলিম বাহিনীর খবর ছিল না। তবে তাদের অন্তরে আশঙ্কা ছিল যে, যেকোনো সময় মুসলিম বাহিনী মক্কায় আক্রমণ করতে পারে। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি তারা চলে আসবে—এটি তাদের ধারণায় ছিল না।

নবীজি মুজাহিদ বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে বিনা বাধায় মক্কায় প্রবেশ করলেন। প্রথমে তিনি কাবা ঘরের দিকে গেলেন। তাঁর চারপাশে আনসার ও মুহাজিরগণ ঘিরে ছিলেন।

কাবায় গিয়ে তিনি আল্লাহর ঘরের তাওয়াফ করলেন। নবীজির হাতে একটি ধনুক ছিল। সে সময় কাবার অভ্যন্তরে ৩৬০টি মূর্তি ছিল। ধনুকের মাধ্যমে একে একে তিনি মূর্তিগুলো ভেঙে ফেললেন। এ সময় তিনি কোরআনের এই আয়াতটি পাঠ করছিলেন— “সত্য এসেছে, আর মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে; নিশ্চয়ই মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল।”

নবীজি কাবার ভেতরে প্রবেশ করলেন এবং নামাজ আদায় করলেন। নামাজ শেষে বাইরে আসলেন। কুরাইশরা তখন সারিবদ্ধভাবে বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল।

তাদের উদ্দেশে তিনি বললেন— “হে কুরাইশ সম্প্রদায়! তোমাদের সঙ্গে আজ আমি কেমন আচরণ করবো বলে মনে করো?”

সকলেই উচ্চকণ্ঠে বলল— “আমরা আপনার কাছ থেকে উত্তম আচরণ আশা করি। আপনি সম্মানিত ভাই এবং সম্মানিত ভাইয়ের সন্তান।”

রমজান ঘিরে মসজিদুল হারাম ও নববিতে বিশেষ কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে।

পবিত্র রমজানে মক্কা-মদিনার এই উপাখ্যানটি কেবল ইতিহাসের পাতায় লেখা কোনো শুষ্ক বিবরণ নয়; বরং এটি ধৈর্য, ত্যাগ, ঈমান এবং অবিশ্বাস্য এক ক্ষমার অনুপম কাহিনি। মানব ইতিহাসে এমন বিজয় খুব কমই আছে, যেখানে শক্তি ও প্রতিশোধের বদলে দয়া ও ক্ষমাই হয়ে ওঠে বিজয়ের প্রকৃত পরিচয়।

কুরাইশদের অত্যাচার তখন সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। দীর্ঘ তেরো বছর মক্কার উত্তপ্ত বালু ছিল নির্যাতিত মুসলমানদের আর্তনাদের সাক্ষী। রাতের অন্ধকারে অত্যাচারের কান্না আর দিনের প্রখর রোদে অপমানের ভার যেন মিশে ছিল সেই শহরের বাতাসে।

যে শহরের অলিগলিতে নবী মুহাম্মাদ (সা.) শৈশব কাটিয়েছিলেন, যে রাজপথে তিনি সততা ও সত্যবাদিতার জন্য “আল-আমিন” নামে পরিচিত ছিলেন, সেই পথগুলোই একদিন তাঁর জন্য হয়ে উঠেছিল কাঁটা আর আগুনের পথ।

৬২২ খ্রিস্টাব্দে মদিনায় হিজরত ছিল সেই বেদনাময় বিচ্ছেদের সূচনা। কিন্তু হিজরত করেও মুসলমানরা শান্তি পায়নি। বদর, উহুদ ও খন্দকের মতো যুদ্ধ তাদের একের পর এক পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল। তবুও নবীজি (সা.) প্রতিটি মুহূর্তে ধৈর্য, প্রজ্ঞা এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসার পথই বেছে নিয়েছিলেন।

এরই মাঝে ৬ হিজরিতে সম্পাদিত হয় হুদায়বিয়ার ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি। অনেক সাহাবীর কাছে সেই চুক্তি প্রথমে অসম মনে হলেও বাস্তবে সেটিই ছিল ইসলামের জন্য এক কৌশলগত বিজয়।

কিন্তু কুরাইশদের মিত্ররা যখন মুসলমানদের মিত্র গোত্রের ওপর আক্রমণ চালায়, তখন সেই চুক্তি ভেঙে যায়। ইতিহাসের চাকা যেন নতুন এক মোড় নেয়। এবার মক্কার পথে যাত্রা অনিবার্য হয়ে ওঠে।

৮ হিজরির রমজান মাস। মরুভূমির রাত তখন নীরব, কিন্তু সেই নীরবতার মাঝেই জন্ম নিচ্ছিল এক ঐতিহাসিক অভিযাত্রা। নবী (সা.)-এর নেতৃত্বে প্রায় দশ হাজার সাহাবীর এক বিশাল কাফেলা মদিনা থেকে মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হলো।

তাদের হাতে অস্ত্র ছিল, কিন্তু হৃদয়ে ছিল না প্রতিশোধের আগুন; ছিল কেবল আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা।

যখন এই বাহিনী মক্কার কাছাকাছি পৌঁছাল, মরুভূমির বালু যেন কেঁপে উঠল তাদের পদচারণায়। মক্কার মানুষ আতঙ্কে কাঁপতে লাগল। তারা জানত এরা সেই মানুষ, যাদেরকে তারা একদিন নির্যাতন করেছে, ঘরবাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল। আজ তারা ফিরে এসেছে শক্তি ও বিজয়ের বেশে।

বিজয়ীর বেশে যখন মুহাম্মাদ (সা.) মক্কায় প্রবেশ করলেন, তাঁর মাথা ছিল বিনয়ে অবনত। তাঁর দৃষ্টি ছিল সিজদার মতো নত, যেন তিনি কোনো বিজয় উদযাপন করতে আসেননি; বরং আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জানাতে এসেছেন।

নবীজি (সা.) ধীরে ধীরে কাবা শরিফের দিকে এগিয়ে গেলেন। চারপাশে ছিল হাজারো মানুষের নিঃশব্দ অপেক্ষা। তিনি কাবার চারপাশে স্থাপিত তিন শতাধিক মূর্তি ভাঙতে ভাঙতে কোরআনের সেই আয়াত পাঠ করছিলেন—

“সত্য এসেছে, আর মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে; নিশ্চয়ই মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল।”

কাবার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি মক্কার মানুষের দিকে তাকালেন। তারা ভয়ে নিঃশ্বাস আটকে রেখেছিল—আজ কী শাস্তি অপেক্ষা করছে তাদের।

কিন্তু ইতিহাসের সেই মুহূর্তে নবীজি (সা.) ঘোষণা করলেন— “আজ তোমাদের বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেই। যাও, তোমরা সবাই মুক্ত।”

প্রতিশোধের বদলে ক্ষমা, ক্রোধের বদলে দয়া—এই মহত্ত্ব দেখে অনেকের হৃদয় গলে যায়। যারা একদিন ইসলামের বিরুদ্ধে তলোয়ার তুলেছিল, তাদের অনেকেই সেই দিনই সত্যের আলোয় আলোকিত হয়।

মক্কা বিজয় শুধু একটি শহর জয়ের গল্প নয়; এটি মানুষের হৃদয় জয়ের গল্প। এটি শিক্ষা দেয়—শক্তির প্রকৃত সৌন্দর্য প্রতিশোধে নয়, বরং ক্ষমায়।

এই কারণেই ইতিহাসের পাতায় মক্কা বিজয় এক অনন্য অধ্যায় হয়ে আছে, যেখানে বিজয়ের মুকুট পরেও একজন মানুষ বিনয়ের সঙ্গে মাথা নত করে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন