রবিবার
১২ এপ্রিল ২০২৬, ২৯ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
রবিবার
১২ এপ্রিল ২০২৬, ২৯ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

এপ্রিলেই হামের টিকা পাবে সব শিশু

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ১১ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৪৭ পিএম আপডেট : ১১ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৫০ পিএম
টিকা
expand
টিকা

দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে অতি ছোঁয়াচে রোগ হাম। আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে হাসপাতালে ভিড় করছেন স্বজনরা। চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে শনিবার (১১ এপ্রিল) পর্যন্ত চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে আক্রান্ত ও উপসর্গ থাকা ১৬ হাজার ৮৭৪ শিশুকে। সংক্রমণ ঠেকাতে চলতি মাসেই প্রায় দুই কোটি শিশুকে টিকার আওতার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে সরকার।

গত পাঁচ বছরের মধ্যে দেশে এ রোগে আক্রান্তের সংখ্যা এটিই সর্বোচ্চ। ভাইরাসটিতে অন্তত ১৬৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। উচ্চ সংক্রমিত কয়েকটি এলাকাকে সংক্রমণের হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একাধিক উপজেলাকে ‘রেড জোন’ ঘোষণা করা হয়েছে।

প্রাদুর্ভাব থামাতে গত ৫ এপ্রিল শুরু হয়েছে টিকাদান ক্যাম্পেইন। এখন পর্যন্ত সাড়ে চার লাখেরও বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। রোববার (১২ এপ্রিল) চারটি সিটি করপোরেশন এবং ২০ এপ্রিল সারা দেশে টিকা দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে প্রায় দুই কোটি শিশুকে টিকার আওতায় আনতে চায় সরকার।

গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হামে আক্রান্ত ও উপসর্গ থাকা ৯৬০ জনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। মৃত্যু হয়েছে দুজনের। এ নিয়ে ১৫ মার্চ থেকে শনিবার (১১ এপ্রিল) পর্যন্ত হামজনিত জটিলতা নিয়ে ১৬ হাজার ৮৭৪ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। মারা গেছে ১৬৯ জন। মৃতদের মধ্যে হাম নিশ্চিত হওয়া গেছে ২৪ জনের।

সংক্রমণের বিস্তার সবচেয়ে বেশি ঢাকা, রাজশাহী, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগে। এসব বিভাগের বেশকিছু জেলা ও সিটি করপোরেশন এলাকা সংক্রমণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আক্রান্তদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছয় হাজার ৭৮ জন চিকিৎসা নিয়েছে ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২ হাজার ৬৯০ জন পাওয়া গেছে রাজশাহীতে। এছাড়া চট্টগ্রামে ২ হাজার ৫ জন, খুলনায় ১ হাজার ১৬৬ জন, বরিশালে ৯০৮ জন, সিলেটে ৬৪৪ জন, রংপুরে ৫৪৬ জন এবং ময়মনসিংহে ৩৪৮ জন চিকিৎসা নিয়েছেন।

আক্রান্ত ঢাকায় বেশি হলেও মৃত্যু বেশি হয়েছে রাজশাহী বিভাগে। মারা যাওয়া ১৬৯ জনের মধ্যে রাজশাহীতেই ৬২ জন। এরপরই অবস্থান ঢাকার, যেখানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৫৯ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। চট্টগ্রামে ১০, খুলনায় ৯, সিলেটে তিন এবং বরিশালে মারা গেছে দুই শিশু।

রাজধানী ও ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোতে সরেজমিনে ঘুরে জানা যায়, আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ৭০ শতাংশের বয়স ২ বছরের নিচে। ৩৫ শতাংশের বয়স ৯ মাসের কম। মৃত্যুর হারেও একই অবস্থা।

পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ রোগী বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলতি বছর দেশে হাম ও রুবেলা ভাইরাসের সংক্রমণ বন্ধের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু চলতি বছরই আক্রান্তের হার গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে প্রতি ১০ লাখে আক্রান্তের হার ছিল ১ দশমিক ৪১ শতাংশ, ২০২৩ সালে ১ দশমিক ৬০, ২০২৪ সালে ১ দশমিক ৪৩ এবং ২০২৫ সালে এই হার ছিল শূন্য দশমিক ৭২ শতাংশ। এবার এটি বেড়ে ১৭ শতাংশের কাছাকাছি দাঁড়িয়েছে।

ক্যাম্পেইনে টিকা পেয়েছে সাড়ে ৪ লাখ শিশু সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ এপ্রিল উচ্চ সংক্রমিত ৩০ উপজেলায় শুরু হওয়া টিকাদান কর্মসূচিতে শনিবার পর্যন্ত ৪ লাখ ৫৪ হাজারের বেশি শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়েছে। ইপিআইর একজন কর্মকর্তা জানান, যে ৩০ উপজেলায় শুরু হয়েছে সেখানে ১২ লাখের বেশি শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা ছিল। এর মধ্যে টিকা নিয়েছে সাড়ে চার লাখেরও বেশি শিশু।

রোববার শুরু চার সিটিতে, ২০ এপ্রিল সারা দেশে ঢাকার দুই সিটি এবং বরিশাল ও ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনে রোববার (১২ এপ্রিল) টিকাদান কর্মসূচি শুরু হবে। আর বাকি সিটি করপোরেশনসহ সারা দেশে শুরু হবে আগামী ২০ এপ্রিল। সব মিলিয়ে দেশের মোট এক কোটি ৯৮ লাখ ৮ হাজার ৪২৪টি শিশুকে টিকার আওতায় আনা হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক ও ইপিআই কর্মকর্তা ডা. শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, ‘সরকারের লক্ষ্য দ্রুত ৫ বছরের কম বয়সি সব শিশুর হামের টিকা নিশ্চিত করা। এজন্য বিশেষ ক্যাম্পেইন। চলতি মাসেই সব শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।’

সংক্রমণের কারণ উদ্ঘাটনে উদ্যোগ চান বিশেষজ্ঞরা হামের এমন উচ্চ প্রকোপের পেছনে শুধু টিকাদানে পিছিয়ে থাকাকেই মূল কারণ হিসেবে মানতে নারাজ বিশেষজ্ঞরা। প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের নিয়ে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি তাদের।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আবু জামিল ফয়সাল বলেন, ‘এ ধরনের হঠাৎ কোনো প্রাদুর্ভাব হলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত একটি টিমের মাধ্যমে তদন্ত হওয়া উচিত, যারা সরেজমিনে গিয়ে একেবারে প্রান্তিক অঞ্চলের যেসব শিশু আক্রান্ত ও মারা গেছে, তাদের প্রতিটি তথ্য ঘেঁটে দেখবেন। আক্রান্ত ও মৃতরা আদৌ টিকা নিয়েছিল কিনা, নেওয়া থাকলে তারপরও কেন আক্রান্ত হলো, টিকা দিয়ে থাকলে কার্ডে উল্লেখ আছে কিনা; এসব বিষয় নিয়ে সর্বোচ্চ গবেষণা হওয়া উচিত। পাশাপাশি যেখানে প্রথম প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়, সেখানে শনাক্ত হওয়ার পর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা কোনো কর্মপরিকল্পনা ঠিক করেছিলেন কিনা—সেটিও দেখতে হবে। এগুলো ত্বরিত গতিতে নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের দিয়ে হওয়া উচিত। সংক্রমণের প্রায় চার সপ্তাহ হলো কিন্তু এখনো এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।’

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন বলেন, ‘কেন হঠাৎ করে এমন ভয়াবহ রূপ নিল অবশ্যই সে রহস্য উদ্ঘাটনে তদন্ত হওয়া জরুরি। শুধু তদন্ত না, যেখানেই রোগী পাওয়া যাচ্ছে, তার চারপাশে একটি নির্দিষ্ট সীমানা ধরে কাজ করতে হবে। এর মধ্যে কতজনের জ্বর আছে, কার কী উপসর্গ সেটিও দেখতে হবে। তাদের নিকটস্থ হাসপাতালে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তাদের মাধ্যমে আর কেউ সংক্রমণ ছড়াতে না পারে।’

সূত্র: এশিয়া পোস্ট।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন