

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


রপ্তানিকারকদের কাঁচামাল আমদানির জন্য স্বল্প সুদে ডলার ঋণ দেওয়ার বিশেষ তহবিল এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড (ইডিএফ) পরিচালনায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সাত বছর আগে জারি করা ২০১৭ সালের নির্দেশনা এবং পরে বিভিন্ন সময়ে দেওয়া সব সার্কুলার বাতিল করে এবার একটিমাত্র সমন্বিত অপারেশনাল গাইডলাইন জারি করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
নতুন নির্দেশনায় সুদের হার, ঋণের সীমা, পরিশোধের সময়, আবেদন প্রক্রিয়া এবং খেলাপি হলে করণীয়—সবকিছুই নতুন করে সাজানো হয়েছে। অতীতে ইডিএফের অপব্যবহার ও অনিয়মের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার নজরদারি ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা যায়।
কী এই ইডিএফ?
ইডিএফ হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার একটি পুনঃঅর্থায়ন তহবিল। এর মাধ্যমে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কম সুদে ডলার ঋণ নিয়ে রপ্তানিকারকদের কাঁচামাল আমদানির জন্য অর্থায়ন করে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, নিটওয়্যার, চামড়া, হিমায়িত খাদ্য, আসবাবপত্রসহ রপ্তানিমুখী শিল্প এই তহবিলের সুবিধা পেয়ে থাকে।
এর মূল উদ্দেশ্য হলো, রপ্তানিকারকদের কম খরচে বৈদেশিক মুদ্রা সরবরাহ করে উৎপাদন ও রপ্তানি সচল রাখা।
নতুন নিয়মে কী সুবিধা পাবেন রপ্তানিকারকরা?
নির্দেশনা অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকগুলো ৬ মাস মেয়াদি SOFR + ০.৫০ শতাংশ সুদে ডলারে ইডিএফ ঋণ পাবে। আর এডি ব্যাংকগুলো রপ্তানিকারকদের কাছে সর্বোচ্চ ৬ মাস মেয়াদি SOFR + ১.৫০ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করতে পারবে। ফলে আগের তুলনায় সুদের হার নির্ধারণে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সুদ কমলে রপ্তানিকারকরাও কম খরচে ঋণ পাবেন।
এ ছাড়া ঋণের আবেদন, অনুমোদন ও সময় বাড়ানোর প্রক্রিয়াও স্পষ্ট করা হয়েছে। সাধারণভাবে ঋণের মেয়াদ ১৮০ দিন হলেও প্রয়োজন হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনে তা ২৭০ দিন পর্যন্ত বাড়ানো যাবে।
কোন খাত কত সুবিধা পাবে?
নতুন নির্দেশনায় বিভিন্ন রপ্তানি খাতের জন্য সর্বোচ্চ ঋণসীমাও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। বিজিএমইএভুক্ত প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ ২ কোটি (২০ মিলিয়ন) ডলার, বিকেএমইএ ও চামড়া খাত ১ কোটি ৫০ লাখ (১৫ মিলিয়ন) ডলার এবং অন্যান্য খাত নির্ধারিত সীমার মধ্যে ঋণ নিতে পারবে।
একইসঙ্গে স্থানীয়ভাবে রপ্তানিকারকদের কাঁচামাল সরবরাহকারী বাল্ক আমদানিকারকদের জন্যও আলাদা সুবিধা রাখা হয়েছে।
এবার যেসব ক্ষেত্রে কড়াকড়ি
নতুন নির্দেশনার সবচেয়ে বড় দিক হলো—যেসব প্রতিষ্ঠান রপ্তানি আয় সময়মতো দেশে আনবে না বা আগের ইডিএফ ঋণ পরিশোধ করবে না, তারা নতুন করে এই তহবিলের সুবিধা পাবে না।
এ ছাড়া কোনো ব্যাংক যদি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে নেওয়া ইডিএফ ঋণ সময়মতো পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেই ব্যাংকও নতুন করে ইডিএফ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে।
ঋণ পরিশোধে বিলম্ব হলে অতিরিক্ত ৪ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানা সুদ আরোপের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
কেন এই পরিবর্তন?
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক শীর্ষ কর্মকর্তা এনপিবি নিউজকে বলেন, ‘গত এক দশকে ইডিএফ বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের অন্যতম বড় সহায়ক তহবিল হয়ে ওঠে। কিন্তু একই সঙ্গে এই তহবিল নিয়ে নানা অনিয়ম ও অপব্যবহারের অভিযোগও সামনে আসে। আগের অনিয়ম ও অপব্যবহারের অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে এবার সার্কুলার দেওয়া হয়েছে। আমরা এই ফান্ডকে কঠোর নজরদারিতে রাখবো।’
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ইডিএফ ফান্ডের অপব্যবহার করা হয়। এছাড়া কয়েকটি ব্যাংক ও শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, ইডিএফের ডলার প্রকৃত কাঁচামাল আমদানির পরিবর্তে অন্য খাতে ব্যবহার করা হয়েছে। কোথাও কোথাও রপ্তানি আয় দেশে না ফিরলেও নতুন করে ঋণ নেওয়া হয়েছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে একই প্রতিষ্ঠানের জন্য বারবার ঋণ নবায়নের অভিযোগও ওঠে।
ডলার সংকটের সময় ইডিএফের অর্থ ফেরত না আসায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপরও চাপ তৈরি হয়েছিল। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধাপে ধাপে তহবিলের আকার কমানো, সুদের হার পরিবর্তন এবং নজরদারি জোরদারের উদ্যোগ নেয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন অপারেশনাল গাইডলাইন সেই অভিজ্ঞতারই ধারাবাহিকতা। এর মাধ্যমে ইডিএফ ব্যবস্থাপনাকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার চেষ্টা করা হয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকদের মতে, নতুন নির্দেশনা রপ্তানিকারকদের জন্য ইতিবাচক। কারণ এতে সব নিয়ম এক জায়গায় থাকায় বিভ্রান্তি কমবে এবং ঋণ নেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ হবে।
অর্থনীতিবিদ মাজেদুল হক এনপিবি নিউজকে বলেন, ‘শুধু নতুন নিয়ম করলেই হবে না। অতীতের মতো যাতে ইডিএফের অর্থ অন্য খাতে ব্যবহার না হয়, রপ্তানি আয় যথাসময়ে দেশে ফেরে এবং ব্যাংকগুলো যথাযথভাবে তদারকি করে—সেটিই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’
নতুন নির্দেশনায় রপ্তানিকারকদের জন্য অর্থায়নের সুযোগ যেমন বজায় রাখা হয়েছে, তেমনি অতীতের অপব্যবহার ঠেকাতে কঠোর শর্ত ও নজরদারির ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে। ফলে ইডিএফ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।