শুক্রবার
২৪ জুলাই ২০২৬, ৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শুক্রবার
২৪ জুলাই ২০২৬, ৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নজরুলকাণ্ডে টালমাটাল জামায়াত, সাতক্ষীরায় সুযোগ দেখছে বিএনপি

মো. হোসেন আলী, সাতক্ষীরা
প্রকাশ : ২৩ জুলাই ২০২৬, ০৪:৪৫ পিএম
গাজী নজরুল ইসলাম
expand
গাজী নজরুল ইসলাম

সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর) আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নেতা গাজী নজরুল ইসলাম ঘিরে একের পর এক স্ক্যান্ডাল ছড়ানোর পর থেকে জেলার রাজনীতিতে বিশাল তোলপাড় শুরু হয়েছে। ভিডিও আড়াল করতে প্রথমে এআই প্রযুক্তির কারসাজি, চালকের ষড়যন্ত্র এবং পরবর্তীতে ‘দ্বিতীয় স্ত্রী’র দাবি তুলে আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা করা হলেও কোনো কিছুতেই পাড় পাননি এই জনপ্রতিনিধি।

নথিপত্রের অমিল, অসংলগ্ন তথ্য ও চারিত্রিক স্খলনের অভিযোগে জামায়াতের কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে গাজী নজরুল ইসলামকে বহিষ্কার করার পর দলটির ভাবমূর্তিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক এই ঘাঁটিতে জামায়াতের আধিপত্যে হঠাৎ ফাটল ধরায় জেলাজুড়ে বিরোধীদের কপাল খোলার পথ পরিষ্কার হচ্ছে।

সর্বশেষ অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাতক্ষীরার চারটি আসনেই বিএনপির ঝুলি ছিল শূন্য। সবকটি আসনেই বিজয়ের মুখ দেখে জামায়াত ও অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা। তবে সাতক্ষীরা-৪ আসনের এই সংসদ সদস্যের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড এবং দল থেকে বিতাড়িত হওয়ার ঘটনা বিএনপির জন্য এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।

রাজনৈতিকভাবে শ্যামনগর এলাকাটিকে জামায়াতের ভেটেরান দুর্গ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও একজন দায়িত্বশীল নেতার এমন স্ক্যান্ডাল, নথিপত্রে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া ও দলচ্যুত হওয়ার খবর স্থানীয় সমর্থকরা হতাশায় ডুবেছেন। আদর্শ ও নৈতিকতার রাজনীতি দাবি করা দলটির সমর্থকদের মাঝে যে গভীর অসন্তোষ দেখা দিয়েছে, তা বিএনপির জন্য বাড়তি সুবিধা এনে দিচ্ছে। মাঠপর্যায়ে নিষ্ক্রিয় থাকা বিরোধীদের কাছে এটি এক বড় রাজনৈতিক সুযোগ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সাতক্ষীরা-৪ আসনে ১ লাখ ৬ হাজার ৯১৩ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন গাজী নজরুল ইসলাম। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির ড. মো. মনিরুজ্জামান পেয়েছিলেন ৮৫ হাজার ৪২৬ ভোট। দুজনের ভোটের তফাত ছিল মাত্র ২১ হাজার ৪৮৭। বর্তমানে কেন্দ্র থেকে প্রার্থী বহিষ্কৃত হওয়ায় এবং দলটি নৈতিক সংকটে পড়ায় সাংবিধানিক আইনি পদক্ষেপ শেষে যদি এখানে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তবে এই সামান্য ব্যবধান পেছনে ফেলে ধানের শীষের প্রার্থীর জয় নিশ্চিত করা একেবারেই সম্ভব বলে মনে করছেন অভিজ্ঞ পর্যবেক্ষকেরা।

পরিস্থিতির মেরুকরণে স্বভাবতই সুবিধাজনক স্থানে উঠে এসেছে জেলা বিএনপি। দলের গত নির্বাচনের মনোনীত প্রার্থী ড. মো. মনিরুজ্জামান জানান, একজন সংসদ সদস্যের চারিত্রিক পতন পুরো সাতক্ষীরাবাসীকে লজ্জায় ফেলে দিয়েছে। গত নির্বাচনে চারটি আসনের একটিতেও বিএনপি জয় না পেলেও মানুষ এখন প্রকৃত চিত্র বুঝতে সক্ষম হয়েছে। সাংবিধানিক উপায়ে আসনটি খালি হয়ে ফের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে জনগণ বিপুল রায় দিয়ে বিএনপির জয়ের খরা কাটিয়ে তুলবে।

একই সুর মিলিয়ে সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আবু জাহিদ ডাবলু বলেন, জামায়াতের অভ্যন্তরীণ নৈতিক সংকট এখন আর গোপন নেই। অবাধ ভোট হলে সাতক্ষীরা-৪ আসনে বিএনপির জয় নিশ্চিত।

মাঠের প্রতিক্রিয়ার কথা উল্লেখ করে জেলা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. শাহীন ইসলাম বলেন, জনপ্রতিনিধির এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন কাণ্ডে সাধারণ মানুষ আজ ক্ষুব্ধ। শ্যামনগরে এমপির কুশপুত্তলিকা পোড়ানো এবং দল থেকে ছাঁটাইয়ের খবর শুনে জনগণের মিষ্টি বিলানোর দৃশ্যই বলে দিচ্ছে জামায়াতের সেই ঘাঁটিতে ধস নেমেছে।

গত নির্বাচনে খালি হাতে ফেরা বিএনপির জন্য এই সম্ভাব্য উপনির্বাচন মাঠ পুনরুদ্ধারের সবচেয়ে বড় সুযোগ।

অন্যদিকে, শৃঙ্খলা ও সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই গেয়ে সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা আজিজুর রহমান জানান, দলের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তকে তারা সাধুবাদ জানিয়েছেন। নীতি ও শৃঙ্খলার ব্যাপারে জামায়াত কখনো আপস করে না। একজন ব্যক্তির অন্যায়ের দায় পুরো সংগঠনের ওপর চাপানো অনুচিত। দল উপযুক্ত মনে করেই এই সাংগঠিক পদক্ষেপ নিয়েছে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, সামনে নির্বাচন এলে সংগঠনের দিকনির্দেশনা অনুযায়ী মাঠে কাজ করা হবে। নৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করায় জনগণ বিষয়টিকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখবে বলেই তাদের বিশ্বাস। তবে এ ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা সাময়িক রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে বলে স্বীকার করেন তিনি।

এমপি পদ শূন্য হওয়ার আইনি মারপ্যাঁচ নিয়ে মতামত দিয়েছেন সাতক্ষীরা জজ কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী অ্যাডভোকেট এস এম বিপ্লব হোসেন। তিনি জানান, দল থেকে বহিষ্কৃত হলেই যে সংসদীয় আসন সঙ্গে সঙ্গে খালি হয়ে যাবে—বিষয়টি তেমন নয়। নির্বাচন কমিশন দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে, কিন্তু স্রেফ চিঠি পাওয়ার ওপর ভিত্তি করে আসন শূন্য ঘোষণা করার এখতিয়ার তাদের হাতে নেই।

তিনি স্পষ্ট করেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্য পদ বাতিলের কিছু নির্দিষ্ট শর্ত (যেমন দলত্যাগ বা বিপক্ষে ভোট প্রদান) রয়েছে। শুধুমাত্র দলীয় বহিষ্কারের কারণে আসন খালি হয় না। ফলে আসন শূন্য ঘোষণা ও সম্ভাব্য উপনির্বাচনের বিষয়টি পুরোপুরি স্পিকার ও আদালতের আইনি পর্যালোচনার ওপর নির্ভর করছে।

আইনি সিদ্ধান্ত যেদিকেই যাক না কেন, চার আসনের একটিতেও জয় না পাওয়া বিএনপির কাছে এই রাজনৈতিক পরিবর্তন বিশাল এক বার্তা নিয়ে এসেছে। আসন খালি হলে উপনির্বাচন কেবল একটি জয়-পরাজয়ের লড়াই হবে না, বরঞ্চ দুই দলের রাজনৈতিক অবস্থান পুনর্নির্ধারণের এক বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন