

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভারপ্রাপ্ত উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) ডা. মানসী রানী সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম, অসদাচরণ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিস্তৃত অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়—প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষে তিনি ২০১০ সালে এডহক মেডিকেল অফিসার হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। পরে তদবির ও প্রভাব খাটিয়ে ২০২৪ সালের ২৮ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৩৮১ নম্বর স্মারকে প্রকাশিত প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে হাতিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভারপ্রাপ্ত ইউএইচএফপিও হিসেবে পদায়ন পান।
দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, অসদাচরণ ও লুটপাটে জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে হাতিয়া পৌরসভার চরকৈলাশ এলাকার মো. সবুজ আহাম্মেদ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। তার অভিযোগের ভিত্তিতে গত মঙ্গলবার (১৯ মে) তিন সদস্যের একটি তদন্ত টিম সরেজমিনে তদন্তে আসে। এই তদন্ত দলের নেতৃত্ব দেন লক্ষ্মীপুরের সিভিল সার্জন মোহাম্মদ আবু হাসান শাহীন। দলের অন্যান্য সদস্য ছিলেন সিভিল সার্জন অফিসের অ্যাসিস্ট্যান্ট চিফ স্ট্যাটিসটিক্যাল অফিসার (ইনচার্জ) এ. এইচ. এম. ফারুক এবং লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. অরূপ পাল। তবে তদন্তের তিন দিন পার হলেও ডা. মানসী আগের মতোই দায়িত্ব পালন করছেন এবং নিজেকে ইউএইচএফপিও পরিচয় দিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন বলে হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়—হাসপাতালের বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীর সাথে প্রায়ই অসদাচরণ করতেন ডা. মানসী। অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর কামরুল হোসেন মাসের পর মাস অনুপস্থিত থাকলেও নগদ অর্থের বিনিময়ে তার বেতন–ভাতা পরিশোধ করা হয়েছে। পরিচ্ছন্নতা কর্মী সাদ্দাম হরিজনকে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত দেখিয়ে তার বেতনের বড় অংশ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলেও উল্লেখ আছে। সাবেক ক্যাশিয়ার ও স্টোরকিপার আমিরুল ইসলাম আকরামের মাধ্যমে অবৈধ অর্থ লেনদেন করা হতো বলেও অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
এ ছাড়া হাতিয়া পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ভুক্তভোগী সোহরাব, মিরাজ ও পারভীন তদন্ত টিম এবং সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালে সিকিউরিটি গার্ড পদে চাকরির আশ্বাস দিয়ে তাদের কাছ থেকে ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়।
মিরাজ জানান, তিনি আকরামের মাধ্যমে ৩০ হাজার টাকা প্রদান করেন এবং প্রায় ১১ মাস চাকরি করেন। পরে তাকে বাদ দেওয়া হলেও টাকা ফেরত পাননি। একই সঙ্গে আকরামের বিরুদ্ধে সরকারি ওষুধ সংগ্রহ ও সরবরাহে ব্যাপক কারসাজির অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগে আরও বলা হয়—স্বাস্থ্য বিভাগের ছয়টি ইউনিয়ন সাব-সেন্টারের পুকুর ও জমি ইজারা বাবদ আদায়কৃত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি। তমরুদ্দি ও বুড়িরচর সাব-সেন্টারের ইজারা বাবদ প্রায় ৯০ হাজার টাকা সংগ্রহ হলেও তা সরকারি খাতে জমা হয়নি বলে উল্লেখ রয়েছে। মা-মনি প্রকল্পে কর্মরত সার্জন, নার্স ও আয়াদের কাছ থেকে কোয়ার্টার ভাড়া নিয়ে তা ব্যক্তিগতভাবে ভোগ করার অভিযোগও তোলা হয়েছে।
অভিযোগকারীরা আরও জানান, কাগজে-কলমে ছয়টি ইউনিয়ন সাব-সেন্টার দেখানো হলেও বাস্তবে চালু রয়েছে মাত্র চারটি, এবং সেগুলোও সপ্তাহে এক–দুই দিন খুব অল্প সময়ের জন্য খোলা থাকে। ডা. মানসী নাকি নিজে পরিদর্শনে না গিয়ে পরিদর্শন খাতায় স্বাক্ষর করে টিএ/ডিএ উত্তোলন করতেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ আছে। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. মানসী রানী সরকার বলেন, “আমি এসব বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।” তদন্ত টিমের প্রধান ও লক্ষ্মীপুর সিভিল সার্জন মোহাম্মদ আবু হাসান শাহীন বলেন, “অভিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অভিযোগকারী ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যও গ্রহণ করা হয়েছে। তদন্ত শেষে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। এরপর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” এদিকে হাতিয়ার সচেতন মহল ডা. মানসী রানী সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত, বিচার ও অপসারণ দাবি করেছেন।