

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতীয় গবাদিপশু পাচার কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না। সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) নিয়মিত অভিযান চালিয়ে কিছু চালান জব্দ করলেও অভিনব কৌশলে অধিকাংশ গরুই পাচার হয়ে পৌঁছে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলার পশুর হাটে। এতে উদ্বেগ বাড়ছে দেশীয় খামারিদের মধ্যে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ব্যাটালিয়ন (৫৩ বিজিবি) এর আওতাধীন সীমান্তের প্রায় ৩৭ কিলোমিটার এলাকা কাঁটাতারবিহীন এবং দুর্গম নদীপথ হওয়ায় এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দিনদিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে শক্তিশালী চোরাচালান সিন্ডিকেট। বিজিবির অভিযানে মাঝেমধ্যে গবাদিপশু জব্দ হলেও মূল হোতারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত সোমবার (২ মার্চ) সকালে ৫৩ বিজিবির বিশেষ টহল দল পৃথক অভিযানে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার সুন্দরপুর ইউনিয়নের কালিনগর গ্রাম থেকে ৮টি এবং চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের বাখেরআলী বিওপির আওতাধীন চাচ্চুরচর এলাকা থেকে আরও ২টি ভারতীয় গরু জব্দ করে। জব্দ হওয়া ১০টি গরুর আনুমানিক বাজার মূল্য প্রায় ২২ লাখ টাকা। পরবর্তীতে গরুগুলো চাঁপাইনবাবগঞ্জ শুল্ক কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসেই সীমান্ত এলাকা থেকে প্রায় ৭৫ লাখ টাকা মূল্যের ৩৩টি গরু ও দুটি মহিষ জব্দ করেছে বিজিবি। এছাড়া গত বছরের শুরু থেকে চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত অভিযানে মোট ৭৯টি গরু ও ২৫টি মহিষ জব্দ করা হলেও আটক হয়েছে মাত্র কয়েকজন চোরাকারবারি। এর মধ্যে চারজন বাংলাদেশি নাগরিক।
গরু পাচারের নেপথ্যে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের জহুরপুর ও জহুরপুরটেক সীমান্ত এলাকায় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী একটি চোরাচালান সিন্ডিকেট। জহুরপুর বিওপি এলাকার সাদেক, আবু, ইকবাল ও মামুন এবং জহুরপুরটেক সীমান্তের ডলার, মুকুল, কুতুবুল ও তৌহিদ—এই আটজনকে স্থানীয়রা গরু পাচার সিন্ডিকেটের মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, গভীর রাতে কলাগাছের ভেলা বা ছোট নৌকা ব্যবহার করে নদীপথে গরু সীমান্ত পার করে আনা হয়। পরে এসব গরু সীমান্তসংলগ্ন আমবাগান বা ফসলি জমিতে অস্থায়ীভাবে লুকিয়ে রাখা হয়। সিন্ডিকেটের লাইনম্যানদের সংকেত পেলে রাতের অন্ধকারে ট্রাকযোগে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এছাড়া বিভিন্ন দপ্তরকে ম্যানেজ করার কথা বলে গরুপ্রতি ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন অভিযুক্ত ব্যক্তি এই অবৈধ কারবারে জড়িত থাকার কথাও স্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে।
প্রলোভনে পড়ে বিপদে সাধারণ মানুষ
গরু পাচার সিন্ডিকেটের মূল হোতারা সাধারণত নিজেদের আড়ালে রেখে সীমান্ত এলাকার দরিদ্র ও শ্রমজীবী মানুষকে বাহক হিসেবে ব্যবহার করছে। টাকার লোভে পড়ে এসব মানুষ অবৈধভাবে সীমান্ত পার হয়ে ভারতে প্রবেশ করছে এবং অনেক সময় সেখানকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হচ্ছে।
গত ২১ জানুয়ারি দিবাগত রাতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার জহুরপুরটেক সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশের পর গরু চোরাচালানের অভিযোগে তিন বাংলাদেশিকে আটক করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার জঙ্গিপুর থানা পুলিশ। সেদিন সিন্ডিকেটের মূল হোতা সাদেক ও কুতুবুলের নেতৃত্বে প্রায় ৫০ জনের একটি দল গরু আনতে ভারতে প্রবেশ করে। ভারতের রঘুনাথগঞ্জের মহালদারপাড়া-রামপুর এলাকায় পৌঁছালে পুলিশ ধাওয়া দিলে তিনজন আটক হন এবং বাকিরা পালিয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক সময় সীমান্তে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া কিংবা নির্যাতনের শিকার হয়ে সাধারণ মানুষই প্রাণ হারাচ্ছে, অথচ সিন্ডিকেটের মূল হোতারা থেকে যাচ্ছে নিরাপদে।
ভারত থেকে অবৈধ পথে গবাদিপশু আসায় দেশের প্রাণিসম্পদ খাত বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয় খামারি রহমত আলী ও মতিউর রহমান জানান, ভারতীয় সস্তা গরুর কারণে দেশীয় খামারিরা বাজারে ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। এতে অনেক খামারি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে খামার ব্যবসা বন্ধ করার কথা ভাবছেন।
এছাড়া কোয়ারেন্টাইন ছাড়াই অবৈধভাবে গবাদিপশু দেশে প্রবেশ করায় বিভিন্ন সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও বাড়ছে। বিশেষ করে খুরা রোগ ও লাম্পি স্কিন ডিজিজের মতো ভাইরাস দেশীয় গবাদিপশুর জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন খামারিরা।
মন্তব্য করুন