শনিবার
২৩ মে ২০২৬, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শনিবার
২৩ মে ২০২৬, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তনু হত্যা মামলায় নতুন মোড়, ৪ অজ্ঞাতনামা এবার আলোচনায় 

এনপিবি ডেস্ক
প্রকাশ : ২২ মে ২০২৬, ০৩:৪৫ পিএম
ছবি সংগৃহীত
expand
ছবি সংগৃহীত

কুমিল্লার বহুল আলোচিত সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলায় দীর্ঘ এক দশক পর নতুন করে অগ্রগতির ইঙ্গিত মিলেছে, যা মামলাটিকে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। ঘটনার পরপরই গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এবং দুই দফা ময়নাতদন্তেও মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণ করা সম্ভব না হওয়ায়, এতদিন তদন্ত কার্যত অচলাবস্থায় ছিল। এখন ঘাতকদের শনাক্তের প্রধান উপায় হিসেবে ডিএনএ পরীক্ষাই একমাত্র ভরসা।

দীর্ঘ সময় ধরে ঝুলে থাকা এই স্পর্শকাতর মামলাটি ৮১ বার শুনানির তারিখ পিছিয়ে যাওয়ার পর সম্প্রতি তদন্তে নতুন গতি পেয়েছে।

চলতি বছরের ৬ এপ্রিল মামলার ষষ্ঠ তদন্তকারী কর্মকর্তা কুমিল্লা আদালতে একটি অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দেন। এতে আগে সংগ্রহ করা ডিএনএ নমুনার সঙ্গে তিন সাবেক সেনাসদস্য-সার্জেন্ট জাহিদ, ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান এবং সিপাহি শাহিনুল আলমের ডিএনএ মিলিয়ে দেখার অনুমতি চাওয়া হয়। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো নির্দিষ্ট সন্দেহভাজনদের পরিচয় সামনে আসে।

এদিকে তদন্তের অংশ হিসেবে সম্প্রতি ঢাকার কেরানীগঞ্জ এলাকা থেকে সাবেক সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমানকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তনু হত্যাকাণ্ডের পর এই প্রথম কোনো সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হলো। বর্তমানে তার ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার প্রক্রিয়া চলছে।

এই নতুন অগ্রগতিতে তনুর পরিবারসহ দেশবাসীর মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত বিচার পাওয়ার আশা আবারও জোরালো হয়ে উঠেছে।

২০১৭ সালের মে মাসে তৎকালীন তদন্ত সংস্থা সিআইডি জানিয়েছিল, তনুর পোশাক থেকে নেওয়া আলামত পরীক্ষা করে ৩ অজ্ঞাত পুরুষের শুক্রাণু পাওয়া গেছে। তবে অতি সম্প্রতি পিবিআই-এর বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির ল্যাব থেকে নতুন তথ্য পেয়েছেন যে, ৩ পুরুষের শুক্রাণু ছাড়াও তনুর পোশাকে আরও এক অজ্ঞাত ব্যক্তির রক্তের উপস্থিতি মিলেছে। ফলে সন্দেহভাজন অজ্ঞাতনামা ঘাতকের সংখ্যা এখন ৪ জনে দাঁড়িয়েছে। এই ৪ জনের ডিএনএ প্রোফাইলের সঙ্গেই সন্দেহভাজনদের ডিএনএ মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ডিএনএ পরীক্ষার তালিকায় থাকা অন্য দুই সন্দেহভাজন বর্তমানে পলাতক। তাদের মধ্যে সাবেক সিপাহি শাহিনুল আলম (ঘটনার সময় ২ সিগন্যাল ব্যাটালিয়নের সৈনিক ছিলেন এবং ঘটনার পরপরই চাকরি থেকে অবসর নেন) বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর মামলা সচল হওয়ার খবরে দেশ ছেড়ে কুয়েতে পালিয়েছেন। পিবিআই-এর বিশ্বস্ত সূত্র তার দেশত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করলেও সংস্থাটি আনুষ্ঠানিকভাবে এখনই মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

অন্যদিকে, সাবেক সার্জেন্ট জাহিদুজ্জামান ওরফে জাহিদ (যিনি ঘটনার সময় ১২ ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাটালিয়নে কর্মরত ছিলেন এবং তনু তার দুই মেয়েকে গৃহশিক্ষক হিসেবে পড়াতেন) বর্তমানে সেনাবাহিনী থেকে অবসরে আছেন। তিনি দেশত্যাগ না করলেও বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছেন। পিবিআই তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে। তনুর বাবা-মা শুরু থেকেই এই সার্জেন্ট জাহিদ ও সিপাহি জাহিদকে (শাহিনুল আলম) জিজ্ঞাসাবাদের দাবি জানিয়ে আসছিলেন।

সম্প্রতি গণমাধ্যমে তনু হত্যা মামলার স্থবিরতা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর, প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং আইনমন্ত্রীর কাছে মামলার অগ্রগতি জানতে চান। এর পরপরই পিবিআই সন্দেহভাজনদের ডিএনএ মেলানোর আদালতের অনুমতি নেয় এবং হাফিজুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে।

তনুর বাবা ইয়ার হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, তিনি গ্রেপ্তারকৃত হাফিজুর রহমানকে আদালতে শনাক্ত করেছেন। ঘটনার সময় হাফিজুর রহমান ৫ সিগন্যাল ইউনিটে কর্মরত ছিলেন এবং প্রায়ই সেনানিবাসের ভেতরের অনুষ্ঠানে তনুকে জিপে করে নিয়ে যেতেন। তনু সেনানিবাসের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান গাইতেন ও উপস্থাপনা করতেন।

ইয়ার হোসেন আরও অভিযোগ করেন, মৃত্যুর দুদিন আগে (১৮ মার্চ, ২০১৬) সেনা কল্যাণ আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ভিক্টোরিয়া কলেজ থিয়েটারের বন্ধুদের সঙ্গে শ্রীমঙ্গলে পিকনিকে গিয়েছিলেন তনু। এ নিয়ে সেনানিবাসের ভেতর তীব্র টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, যা তনু তার বাবাকে কাঁদতে কাঁদতে জানিয়েছিলেন। সেনানিবাসের একজন নিম্নপদস্থ কর্মচারী হওয়ায় ইয়ার হোসেন তখন মুখ খোলার সাহস পাননি।

২০১৬ সালের ২০ মার্চ রাতে কুমিল্লা সেনানিবাসের পাওয়ার হাউসের কাছের একটি ঝোপ থেকে নাট্যকর্মী ও ভিক্টোরিয়া কলেজের ইতিহাস বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সুরতহাল অনুযায়ী, তনুর লম্বা চুল কেটে ফেলা হয়েছিল এবং মাথার পেছনে থেঁতলানোসহ নাক ও মুখে আঘাতের চিহ্ন ছিল।

হত্যাকাণ্ডের পর ময়নাতদন্ত ও আলামত সংগ্রহ নিয়ে চরম জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে। প্রথম ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ডা. শারমিন সুলতানা ‘ফরমায়েশি’ প্রতিবেদন দিয়ে কানের ক্ষতকে পোকার কামড় বলে উল্লেখ করেন। ৩০ মার্চ লাশ কবর থেকে তুলে দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত করেন কুমেক ফরেনসিক বিভাগের তৎকালীন প্রধান ডা. কামদা প্রসাদ (কেপি) সাহার নেতৃত্বাধীন বোর্ড। তারা লাশ পচে যাওয়ার অজুহাতে মৃত্যুর কারণ স্পষ্ট করেননি। উল্টো তৎকালীন র‍্যাবের এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘটনাস্থল থেকে মাটি সরিয়ে হেলিকপ্টারে করে আলামত নষ্ট করার এবং কুমেকের এক নারী চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ধর্ষণের আলামত গোপন করার অভিযোগ তোলেন তনুর পরিবার ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা। পরবর্তীতে সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবের ডিএনএ পরীক্ষাতেই তনুকে হত্যার আগে ধর্ষণের বিষয়টি অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়।

বিগত ১০ বছরে তনু হত্যা মামলায় তদন্তের দায়িত্ব মোট ৫ বার হাতবদল হয়েছে এবং ৬ জন তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হয়েছেন। প্রথমে কোতোয়ালি থানার এসআই সাইফুল ইসলাম, এরপর ডিবির ওসি এ কে এম মনজুর আলম, সিআইডির পরিদর্শক গাজী মোহাম্মদ ইব্রাহীম এবং এএসপি জালাল উদ্দিন আহম্মদ মামলাটি তদন্ত করেন। বর্তমানে পিবিআই ঢাকার পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম মামলাটির তদন্তভার পরিচালনা করছেন।

বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম জানান, নতুন করে একজনের রক্তের সন্ধান পাওয়ায় তদন্তের পরিধি আরও সুনির্দিষ্ট হয়েছে। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে মামলাটি তদারকি করা হচ্ছে। সন্দেহভাজনদের ডিএনএ ম্যাচিং করার প্রক্রিয়া এবং পলাতকদের গ্রেপ্তারের অভিযান একসঙ্গেই চালানো হচ্ছে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন