


রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) জনসংযোগ দপ্তরের উপ-পরিচালক জি.এম. মোর্ত্তজার বিরুদ্ধে নিয়মিত অফিস না করা, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সুবিধা গ্রহণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি বিধিমালা লঙ্ঘন করে একটি এনজিও ও রেডিও সেন্টারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া এনজিও সংস্থার কাজে একাধিকবার বিদেশ ভ্রমণের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
এমনকি তিনি কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকে সংশ্লিষ্ট বেসরকারি সংস্থার কাজে একাধিকবার বিদেশ ভ্রমণ করেছেন বলেও জানা গেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, জি.এম. মোর্ত্তজা সরকারি চাকরিতে বহাল থেকেই সেন্টার ফর কমিউনিকেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (সিসিডি বাংলাদেশ) নামক একটি এনজিও এবং রেডিও পদ্মার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের দাপ্তরিক কাজ ফেলে রেখে তিনি অধিকাংশ সময় এই এনজিও ও রেডিওর বিভিন্ন অনুষ্ঠান, নীতিনির্ধারণী বৈঠক ও ব্যবস্থাপনা কাজে ব্যস্ত থাকেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি অধ্যাদেশ অনুযায়ী, কোনো কর্মকর্তা প্রশাসনের লিখিত অনুমতি ছাড়া কোনো বাণিজ্যিক বা অন্য কোনো সংস্থার পদে যুক্ত থাকতে পারেন না। অভিযোগ রয়েছে, জি.এম. মোর্ত্তজা এই আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দাপ্তরিক সময়ের বড় একটি অংশ ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানের কাজে ব্যয় করেন, যার ফলে মাসের অধিকাংশ সময় তাকে কর্মস্থলে পাওয়া যায় না।
এ বিষয়ে রুয়েটের জনসংযোগ কর্মকর্তা জি.এম. মোর্ত্তজা বলেন, “আমি নিয়মিত অফিস করি না, কারণ আমি আমার পক্ষ থেকে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছি। আমার অফিসে কাজ করার মতো কোনো পরিবেশ নেই এবং চাকরির শুরু থেকে আমার সঙ্গে বৈষম্য করা হয়েছে। এ কারণে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে আমি উপস্থিত থাকছি না।”
তিনি আরও দাবি করেন, “আমি বরেন্দ্র উন্নয়ন প্রচেষ্টা ও রেডিও পদ্মার পরিচালনা কমিটির সদস্য। আমি সেখান থেকে কোনো আর্থিক সুবিধা নিই না এবং চাকরিতে যোগদানের সময় কর্তৃপক্ষ আমাকে এই সংস্থায় যুক্ত হওয়ার অনুমতি দিয়েছিল, যার নথি আমার ফাইলে আছে।” তবে তিনি প্রতিবেদককে কোনো ধরনের নথি দেখাতে পারেননি।
এ ছাড়া তিনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিদেশ ভ্রমণের অনুমতিপত্রও দেখাতে পারেননি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট ও অনুসন্ধানে দেখা যায়, এখন পর্যন্ত রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ৫৫২ জনকে বিদেশে যাওয়ার জন্য অনুমতি/এনওসি দিয়েছে। সেই তালিকায় রুয়েটের জনসংযোগ কর্মকর্তা জি.এম. মোর্ত্তজার নাম নেই।
রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) উপাচার্য অধ্যাপক এস এম আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর জেনেছিলাম, উনি নিয়মিত অফিস করেন না এবং তাকে ডেকে নিয়মিত অফিস করতে নির্দেশ দিয়েছিলাম। তবে গত ঈদুল ফিতরের পর থেকে তিনি অফিস করছেন কি না, সেই তথ্য বর্তমানে আমার কাছে নেই। তিনি যে এনজিও ও রেডিওর ব্যবস্থাপনা পরিচালনা কমিটির সদস্য এবং কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়েছেন বলে দাবি করেছেন, সে বিষয়ে আমি অবগত নই। প্রতিবাদ করতে চাইলে তাকে লিখিত আবেদন করতে হবে।”
উপাচার্য আরও জানান, এনজিও সংস্থা ও রেডিও সেন্টারের সঙ্গে যুক্ত থাকা বা বিদেশ ভ্রমণের অনুমতি নেওয়ার বিষয়ে তিনি অবগত নন এবং তিন মাসের ছুটির কোনো আবেদনও তার কাছে পৌঁছায়নি।
উপাচার্য বলেন, “বিদেশে যাওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়া অবশ্যই বাধ্যতামূলক। এখনও পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে কারা দেশের বাইরে গেছেন, তাদের তালিকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে নিয়মিত প্রকাশ করা আছে। এই তালিকার বাইরে কাউকে অনুমতি দেয়নি রুয়েট প্রশাসন।”
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “যদি অফিস না করা, অনুমতি ছাড়া এনজিও সংস্থা ও রেডিও সেন্টারের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, এমনকি চাকরির শুরু থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া বিদেশ ভ্রমণের প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার আরিফ আহম্মেদ চৌধুরী বলেন, “জনসংযোগ দপ্তরের কর্মকর্তা জি.এম. মোর্ত্তজা ইতিপূর্বে তিন মাসের ছুটির জন্য আবেদন করেছেন— এ তথ্য আমার দপ্তরে আসেনি। তবে তিনি গত ১০/০৫/২০২৬ থেকে ১৮/০৫/২০২৬ তারিখ পর্যন্ত ছুটির জন্য আবেদন করেছেন— এ তথ্য আমার কাছে আছে। আমার জানামতে, চাকরিতে যোগদানের সময় থেকে আজ পর্যন্ত বিদেশ ভ্রমণের বিষয়েও তিনি রুয়েট প্রশাসন বরাবর কোনো আবেদন করেননি।”
তিনি আরও বলেন, “একজন কর্মকর্তার দায়িত্ব হচ্ছে দাপ্তরিক কোনো কাজ বা দাবি থাকলে তা লিখিত আকারে জানানো। কোনো অজুহাতে অফিস বন্ধ রাখা বিধিমোতাবেক পড়ে না। এটি সরকারি আইনেরও লঙ্ঘন।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক ও কর্মকর্তা জানান, জি.এম. মোর্ত্তজা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়মিত অফিস তো করতেনই না, বরং তৎকালীন উপাচার্যরা তাকে ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করতেন না। অনেক ক্ষেত্রে ফোনে ব্যস্ত আছেন বলে এড়িয়ে যেতেন। কোনো কর্মকর্তা তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করলে তিনি তৎকালীন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটনের প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন ধরনের হুমকি দিতেন।
গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি বর্তমানে রাতারাতি ভোল পাল্টে নতুন রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে স্বপদে বহাল রয়েছেন। তার এই রাজনৈতিক ভোল পরিবর্তন ও ক্ষমতার অপব্যবহার সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।