


২১ শে জানুয়ারি ১৯৮১। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হিজবুল বাহারে মেধাবী শিক্ষার্থীদের সামনে একটি উপস্থাপনা দিয়েছিলেন, তাতে রাষ্ট্রপতি পেট্রল ভর্তি একটি বোতল হাতে নিয়ে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বলেছিলেন, “এই বোতলেই আছে বাংলাদেশের পেটের ভেতরে লুক্কায়িত সাত রাজার ধন, পেট্রোল। বিশুদ্ধ পেট্রোল। যা পুড়িয়ে বিমান, গাড়ি, অসংখ্য ভারী যানবাহন, সমুদ্রে জাহাজ অনায়াসে চলাচল করতে পারবে। শক্তির ধাত্রী এই তেল। আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত। তোমরা ভালো করে দেখে রেখো ছেলেমেয়েরা, আমার হাতের মুঠোয় রয়েছে সেই মহার্ঘ নিয়ামত যা বাংলাদেশের সীমানার ভেতরে, মাটির উদরে তোমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে। যা ক্রমাগত বাঁধার ফলে আমি শত চেষ্টা সত্ত্বেও তোমাদের ভাগ্য ফেরাতে তুলে আনতে পারছিনা। আমার জীবনকালে সম্ভবপর না হলে তোমরা, আমার ছেলেমেয়েরা, এই তেল তুলবে।”
বাংলাদেশের মাটির নিচে কি সত্যিই বিপুল তেল-গ্যাস সম্পদ লুকিয়ে আছে? যদি থাকে, তবে আমরা কেনো আজও বিদেশ থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি আমদানি করি? কেনো দেশের বিভিন্ন স্থানে বারবার তেল বা গ্যাসের সন্ধান মিললেও সেগুলোর অধিকাংশই আর উত্তোলনের পর্যায়ে পৌঁছায় না? এগুলো কি নিছক গুজব, নাকি এর পেছনে আছে প্রশাসনিক ব্যর্থতা, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, কর্পোরেট স্বার্থ কিংবা নীরব কোনো ষড়যন্ত্র?
এই প্রশ্নগুলো নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশের মানুষ শুনে আসছে—কোথাও গ্যাস পাওয়া গেছে, কোথাও তেলের গন্ধ মিলেছে, কোথাও টিউবওয়েল থেকে আগুন বের হচ্ছে, কোথাও গভীর মাটির নিচে বিশাল রিজার্ভারের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। কিন্তু রহস্যজনকভাবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই খবর কিছুদিন পর হারিয়ে গেছে। ফলে জনগণের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—বাংলাদেশ কি সত্যিই তার নিজস্ব জ্বালানি সম্পদ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে?
হরিপুর: বাংলাদেশের একমাত্র স্বীকৃত তেলক্ষেত্র
বাংলাদেশের একমাত্র স্বীকৃত তেলক্ষেত্র হলো সিলেটের হরিপুর। আশির দশকে সেখানে তেল আবিষ্কৃত হয় এবং সীমিত পরিসরে উত্তোলনও হয়েছিল। কিন্তু কিছুদিন পর উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। সরকারি ব্যাখ্যা ছিল—কূপে পানির প্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় বাণিজ্যিক উৎপাদন লাভজনক থাকেনি। হরিপুরের পরে সিলেট-১০ গ্যাসকূপ (গোয়াইনঘাট) এবং জৈন্তাপুর, সিলেটে তেলের অস্তিত্ব পাওয়া যায়।
কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—তারপর কি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে পুনরায় অনুসন্ধান বা উন্নত উত্তোলনের চেষ্টা করা হয়েছে? আজকের পৃথিবীতে যেখানে পুরনো ও প্রায় পরিত্যক্ত কূপ থেকেও উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে নতুন করে তেল উত্তোলন সম্ভব হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশের আগ্রহ এত সীমিত কেনো?
শালবাহান: উত্তরবঙ্গের রহস্যময় তেলগাথা
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার শালবাহান বহু বছর ধরে এক রহস্যময় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে, পুরোনো সংবাদপত্রের টুকরো তথ্য, রাজনৈতিক আড্ডা এবং সাম্প্রতিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে বারবার উঠে আসে একটি দাবি—“শালবাহানে তেল পাওয়া গিয়েছিল, কিন্তু তা গোপন করে দেওয়া হয়েছে।”
১৯৮৬–৮৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে পরিচালিত ভূতাত্ত্বিক জরিপ ও অনুসন্ধান কার্যক্রমের সময় ভারতের সীমান্তঘেঁষা শালবাহান জুগিগজ এলাকায় প্রায় ৯০০ মিটার গভীরে তেলের উপস্থিতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সে সময় বিবিসিসহ কিছু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এ সংক্রান্ত খবর প্রচারিত হয়েছিল, যা স্থানীয় মানুষের মধ্যে ব্যাপক আশার সঞ্চার করে। বিভিন্ন সম্ভাবনা যাচাইয়ের পর প্রায় ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। ফরাসি কোম্পানি ফরাসলকে কাজ দেয়া হয়। ১০ এপ্রিল ১৯৮৮ তেলের খনি আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনও করা হয়েছিল। পরীক্ষামূলকভাবে কিছু তেল উত্তোলনের পর হঠাৎ করেই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। পরে কূপটি সিল করে যন্ত্রপাতি সরিয়ে নেওয়া হয়। অনানুষ্ঠানিকভাবে বলা হয়—“এখানে বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য তেল নেই।”
তবে এখানেই শেষ হয়নি আলোচনা। এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রতিবেশি দেশের হেলিকপ্টার এসে ঘুরে যাওয়ার পরে খনি এলাকা চিরতরে বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে ঐ এলাকায় স্কুল, মাদ্রাসা ও বাজার গড়ে তোলা হয় যেন ভবিষ্যতে সেখানে আর অনুসন্ধান বা উত্তোলনের প্রশ্ন না ওঠে। আবার কেউ কেউ দাবি করেন, সীমান্তের ওপারে ভারতের রাজগঞ্জ এলাকায় একই ভূতাত্ত্বিক স্তর থেকে তেল বা গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে, এবং প্রতিবেশীদের স্বার্থেই বাংলাদেশের অপার সম্ভাবনার খনি আলোর মুখ দেখেনি। একই রকম তেলের সম্ভাবনার কথা প্রচার আছে বগুড়ার গাবতলী, সারিয়াকান্দি, শেরপুর, কুমিল্লার লালমাই, নেত্রকোনা এসব এলাকা নিয়ে।
সম্ভাবনার ভূগোল: বাংলাদেশ কি জ্বালানি সম্পদে দরিদ্র?
বাংলাদেশের বর্তমান প্রমাণিত তেল রিজার্ভ কার্যত শূন্যের কাছাকাছি। প্রমাণিত গ্যাস মজুদও দ্রুত কমে আসছে। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী recoverable gas এখন ১০ টিসিএফ-এর নিচে নেমে এসেছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা USGS ২০০১ সালের এক সমীক্ষায় বলেছিল, বঙ্গীয় অববাহিকায় (Bengal Basin) প্রায় ৩২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (TCF) অনাবিষ্কৃত গ্যাস থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। আবার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় উত্তরবঙ্গে সম্ভাব্য তেলস্তরের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এমনকি কিছু আলোচনায় নরওয়েজিয়ান বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, ওই অঞ্চলে প্রায় দুই বিলিয়ন ব্যারেল পর্যন্ত তেলের সম্ভাবনা থাকতে পারে। যদি তার মাত্র ১০ শতাংশও উত্তোলন করা যায়, তাহলে বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদরে তার মূল্য দাঁড়াতে পারে প্রায় ১৫–১৭ বিলিয়ন ডলার।
সম্ভাবনা আর প্রমাণিত রিজার্ভ এক জিনিস নয়
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—“সম্ভাব্য সম্পদ” (potential resource) এবং “প্রমাণিত রিজার্ভ” (proven reserve) এক বিষয় নয়। ভূতাত্ত্বিক জরিপে কোনো অঞ্চলে তেল বা গ্যাসের সম্ভাবনা দেখা গেলেই তা সঙ্গে সঙ্গে উত্তোলনযোগ্য সম্পদ হয়ে যায় না। একটি ক্ষেত্রকে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক প্রমাণ করতে প্রয়োজন:
বাংলাদেশে এসব কাজ পর্যাপ্তভাবে হয়নি—এটাই সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।
অনুসন্ধানের ঘাটতি ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা
বাংলাদেশ মূলত একটি gas-prone basin, অর্থাৎ এখানে তেলের চেয়ে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু স্বাধীনতার পর অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেলেও দেশের বৃহৎ অংশ এখনো পর্যাপ্তভাবে অনুসন্ধান করা হয়নি। বিশেষ করে:
এই অঞ্চলগুলোর বিশাল অংশ এখনো আধুনিক 3D seismic survey-এর আওতায় আসেনি।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা। গভীর সমুদ্র বা গভীর ভূগর্ভে অনুসন্ধান অত্যন্ত ব্যয়বহুল। একটি offshore exploratory well খননেই কয়েকশ মিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হতে পারে। উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল ও উচ্চ ঝুঁকির কারণে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন বিদেশি কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল থেকেছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান BAPEX-এর সক্ষমতাও সীমিত।
আমদানিনির্ভর অর্থনীতি ও “ইমপোর্ট লবি” বিতর্ক
বাংলাদেশ প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ তেল, এলএনজি ও পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি করে। এর সঙ্গে জড়িত হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যবসা। ফলে অনেকের ধারণা—দেশে একটি শক্তিশালী “ইমপোর্ট লবি” গড়ে উঠেছে, যারা দেশীয় অনুসন্ধান জোরালো হোক তা চায় না। কারণ দেশীয় গ্যাস বা তেল উৎপাদন বাড়লে আমদানিনির্ভর বাজার সংকুচিত হবে।
যদিও এ ধরনের অভিযোগের সরাসরি প্রমাণ প্রকাশ্যে নেই, তবুও বাস্তবতা হলো—আমদানিনির্ভর জ্বালানি অর্থনীতি সবসময়ই একটি শক্তিশালী স্বার্থগোষ্ঠী তৈরি করে।
ভারতের ভূমিকা: বাস্তবতা নাকি জনমতের সন্দেহ?
বাংলাদেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান নিয়ে ভারতের প্রসঙ্গ প্রায়ই উঠে আসে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের সীমান্তবর্তী অঞ্চল নিয়ে অনেকেই দাবি করেন—বাংলাদেশে সম্ভাব্য তেলক্ষেত্র থাকা সত্ত্বেও তা উন্নয়ন করা হয়নি, অথচ সীমান্তের ওপারে ভারত অনুসন্ধান ও উৎপাদন চালিয়েছে। এখান থেকেই “ভারত বাংলাদেশের তেল তুলতে দিচ্ছে না” — এমন ধারণা ছড়িয়ে পড়ে। বাস্তবে ভূতাত্ত্বিকভাবে cross-border reservoir পৃথিবীর বহু দেশেই রয়েছে। সীমান্তের একপাশে তেল বা গ্যাস থাকলে অন্য পাশেও তার বিস্তার থাকতে পারে। কিন্তু এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ করেনি যে ভারত বাংলাদেশের তেল বা গ্যাস “চুরি” করছে। এ ধরনের দাবির পক্ষে শক্ত বৈজ্ঞানিক তথ্যও প্রকাশ্যে নেই। ফলে বিষয়টি এখনো মূলত জনমতের সন্দেহ, অসম্পূর্ণ তথ্য ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যার পর্যায়েই রয়েছে।
সবচেয়ে বড় সংকট: তথ্যের অস্বচ্ছতা
সম্ভবত সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো রাষ্ট্রীয় অস্বচ্ছতা। জনগণ জানে না—
এই তথ্য-অস্বচ্ছতার সুযোগেই গুজব, অবিশ্বাস ও ষড়যন্ত্রতত্ত্ব জন্ম নেয়।
জ্বালানি নিরাপত্তা এখন জাতীয় নিরাপত্তা
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এখন জাতীয় নিরাপত্তারই অংশ। ক্রমবর্ধমান শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও নগরায়ণের চাপে জ্বালানির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। অথচ দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো ধীরে ধীরে নিঃশেষ হচ্ছে। এই বাস্তবতায় আমাদের সামনে দুটি পথ: একদিকে আমদানিনির্ভরতা বাড়িয়ে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বৃদ্ধি, অন্যদিকে নিজস্ব সম্পদের বৈজ্ঞানিক ও স্বচ্ছ অনুসন্ধান।
করণীয়: সাহসী ও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি কৌশল
বাংলাদেশকে এখন প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি কৌশল। এর মধ্যে থাকতে হবে:
বাংলাদেশের মাটির নিচে হয়তো মধ্যপ্রাচ্যের মতো অফুরন্ত তেলের ভাণ্ডার নেই। কিন্তু যা আছে, সেটুকুও যদি দক্ষতা, সততা ও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজে লাগানো যায়, তবে তা দেশের অর্থনীতি, শিল্পায়ন ও জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে।
প্রশ্নটি তাই শুধু “তেল আছে কি নেই”—এখানে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো: আমরা কি আমাদের সম্ভাবনাকে জানার, বুঝার এবং কাজে লাগানোর মতো রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতি ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা অর্জন করেছি?
আর শালবাহানের গল্প আজও বাংলাদেশের মানুষের মনে সেই অমীমাংসিত প্রশ্নটিই জাগিয়ে রাখে—
“আমরা কি আমাদের নিজস্ব সম্পদ সম্পর্কে পুরো সত্য জানি এবং সত্যই কি আমরা দেশের জন্য কাজ করি”?