


মানিকগঞ্জে মাছ চুরির অভিযোগে কৃষ্ণ রাজবংশী(৩৫) নামের এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ১০ জনকে আসামি করে সদর থানায় মামলা করেছেন ভুক্তভোগী পরিবার। তবে আসলেই হত্যা নাকি আত্মহত্যা এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে অনেকের মধ্যে। এদিকে মামলা নিয়েও রয়েছে রহস্য।
শনিবার (১০ মে) দিনভর সরেজমিনে নিহতের পরিবার ও প্রতিবেশী এবং ঘটনা স্থলের স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বললে উঠে আসে কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য।
নিহত কৃষ্ণ রাজবংশী মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার বান্দুটিয়া মাঝিপাড়া এলাকার ক্ষুদিরাম রাজবংশীর ছেলে। তিনি বান্দুটিয়া বাজারের ক্ষুদ্র মাছ ব্যবসায়ী।
সিসিটিভি ফুটেজ, স্থানীয় ও বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়,গত ৬ থেকে ৭ দিন আগে তরা বাজারের মাছের আড়ৎ থেকে ৩ কার্টন চিংড়ি মাছ চুরি হয়। সেই মাছ চুরির সন্দেহে বুধবার (৬মে) দিবাগত ভোর ৫ টার দিকে কৃষ্ণ রাজবংশীসহ আরও একজন (রিকশাচালক) কে ধরে বাজারের লোকজন মারধর করে। তবে রিকশাচালক কে ছেড়ে দেওয়া হলেও বাজার ব্যবস্থাপনা সভাপতি মোঃ ইব্রাহিমের জিম্মায় ছেড়ে দেয়া হয় কৃষ্ণ রাজবংশীকে। এরপর দফায় দফায় মারধর করে কমিটির কার্যালয়ে আটকে রাখা হয় তাকে। এরপর কৃষ্ণ রাজবংশীর স্ত্রীর কাছে খবর পাঠানো হয় । সকাল ৯:৩০ ঘটিকার দিকে কৃষ্ণ রাজবংশীর বাড়িতে গিয়ে হাজির হন মাছ ব্যবসায়ী মেঘা ও তার সহযোগী। তারপর বাড়ি থেকে তরা বাজারের সমিতি ঘরে নিহতের স্ত্রীকে নিয়ে যান তারা।
সেখানে কৃষ্ণের স্ত্রীর সামনেও ব্যপক মারধার করা হয়। পরবর্তীতে বিচার কার্যক্রমে তার স্ত্রীর কাছে ৪০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। এই টাকা ব্যবস্থা করতে স্ত্রীকে বাড়ি যাওয়ার নির্দেশ দেন কৃষ্ণ রাজবংশী। তবে সেই টাকা ম্যানেজ করতে না পারলে দুপুর ১টা থেকে ১:৪০ এমন সময় আবারো কৃষ্ণের বাড়ির সামনে হাজির হন মাছ ব্যবসায়ী মেঘা ও তার সহযোগী। অতঃপর টাকা ব্যবস্থা না করতে পারায়, মেঘা ক্ষিপ্ত হয়ে কৃষ্ণের স্ত্রী যমুনা রাজবংশীকে বলেন, এখন টাকা না পেলে মেরে ফেলা ছাড়া উপায় নেই এমনটা বলেই চলে যায় মেঘা।
এই ঘটনার ঘন্টাখানেক পরেই আত্মহত্যার খবর আসে নিহতের স্ত্রী যমুনার কাছে। যমুনা তার স্বামীকে চুরির দায়ে আইনের হাতে তুলে দেওয়ার অনুরোধ করেন তবে তা মানেনি বাজার কমিটির লোকজন। এ ঘটনায় ১০ জনকে আসামি করে অজ্ঞাত আরো ৮/১০ জনের নামে মামলা করা হয়। তবে মামলার কয়েকজন আসামিকে চিনেন না নিহত কৃষ্ণ রাজবংশীর স্ত্রী যমুনা। সেদিন তরা বাজারের আশেপাশে বালু মহালকে কেন্দ্র করে অনেক পুলিশ সদস্য টহলে ছিলো। অনেক পুলিশ সদস্য বেলা ১২ ঘটিকা পর্যন্ত তরা এলাকায় ছিলেন,তবে পুলিশকে টের পেতে দেননি বাজার কমিটির লোকজন। পুলিশ বিকাল সাড়ে তিনটা নাগাদ খবর পেলে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখে মরদেহ নামানো, কে নামিয়েছে কেউ জানে না।
সংসারে আয় উপার্জনের একমাত্র ধারক ছিলেন কৃষ্ণ রাজবংশী তার এই রহস্যজনক মৃত্যুর পর থেকে সংসারে নেমে এসেছে অন্ধকার। তার স্ত্রী যমুনা রাজবংশী একটি ছোট্ট ঘরে ছোট ছেলে-মেয়ে নিয়ে বসবাস করছেন। যমুনা রাজবংশী এখন ন্যায্য বিচারের দাবি করছেন সরকারের কাছে।
এই ঘটনায় তরা বাজার এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে তবে কেউ এবিষয়ে কথা বলতে আগ্রহী নয়। কেউ দেখেননি এবং জানেন না বলে বিভিন্ন অজুহাত দেখান।
সেদিন দায়িত্বে থাকা নাইট গার্ড কবির জানান, এমন মাছ চুরি মাঝেমধ্যেই হয় তবে এমন ঘটনা কোনোদিনও ঘটে নাই। আমার ডিউটি রাত ৪:২৫ পর্যন্ত ছিলো তবে ঘটনা তারও অনেক পরে ঘটছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চায়ের দোকানদার বলেন, মাছের আড়তের নতুন কমিটির গাফলতির কারনে এমন কাণ্ড হয়েছে। আগে কখনও এমন হয় নাই, নতুন কমিটি কবে কেমনে হলো তাও জানি না। এমন চুরির ঘটনা অনেক ঘটছে আগে তবে দুই চারটা চড় থাপ্পড় দিয়ে সড়ায় দিছে। পোলাটারে কয়েক দফায় মারধর করছে এমন ভাবে মারধর করছে যা মর্মান্তিক।
এদিকে নিহত কৃষ্ণ রাজবংশীর স্ত্রী যমুনা রাজবংশী বলেন, ঘটনার তিনদিন আগের ঘটনার জের ধরে তাকে চোর সন্দেহে মারছে। আইনের হাতে তুলে দিত আমার কোনো আফসোস আছিলো না। আমার কাছে ৪০ হাজার টাকা চাইছে বিচারে। আমার স্বামী বাড়িতে গিয়ে টাকা ব্যবস্থা করতে বললো কিন্তু পারলাম না দেইখা মেঘা ও তার সহযোগী সাড়ে বারোটা বা একটার দিকে আমার বাড়িতে গিয়ে যাওয়ার সময় বললো, টাকা যেহেতু দিলিনা মাইরা ফেলান ছাড়া উপায় নাই। এরপর বিকেল চারটার দিকে খবর পাইলাম সে নাকি গামছা দিয়ে ফাঁসি নিয়া আত্মহত্যা করছে। সে ফাঁসি নেওয়ার মত কোন লোক না এমনকি কোন গামছাও তার কাছে আছিলো না। যদি ফাঁসি নিত তাহলে আমারে টাকা ব্যবস্থা করতে বলল কেনো? আমার এখন পরিবারের আয় উপার্জনের কেউ নাই। পোলাপান দুইটাও ছোট ছোট, কি খাইয়া বাচুম ভগবান জানে!
মামলার ১০ জন আসামির মধ্যে সবাই সেখানে উপস্থিত বা জড়িত ছিলেন কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমার ওই সময় মাথা কাজ করে নাই কিন্তু আমি মেঘা আর সাথে আরেকজন এই দুই জনকে দেখছি। আর বিচারে বাজার কমিটির সভাপতি আর সেক্রেটারি আছিলো আর বাকি কাউরে ওইভাবে চিনি না।
তবে এ বিষয়ে জানার জন্য বাজারের সভাপতি মোঃ ইব্রাহিম ও সাধারণ সম্পাদক বেলাল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও কাওকে পাওয়া যায়নি। মোবাইল নাম্বার বন্ধ পাওয়া যায় এবং কার্যালায়টিও তালাবদ্ধ রয়েছে।
এ দিকে তরা মাছ আরৎ কমিটির জয়চাঁদ রাজবংশী সভাপতি ও খোকন রাজবংশী সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে মামলায় তাদের নাম না থাকলেও নাম এসেছে সাবেক সভাপতিরও।
এ বিষয়ে মানিকগঞ্জ সদর থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ ইকরাম হোসেন জানান, পোস্টমর্টেম এর পরে জানা যাবে এটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা। তবে তদন্ত সাপেক্ষেই আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।