রবিবার
১০ মে ২০২৬, ২৭ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
রবিবার
১০ মে ২০২৬, ২৭ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৫৪ বছর পর ফিরে এলেন নিখোঁজ জেলে ছৈয়দ আহাম্মদ

হাতিয়া (নোয়াখালী) প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০৯ মে ২০২৬, ১১:৫২ পিএম
expand
৫৪ বছর পর ফিরে এলেন নিখোঁজ জেলে ছৈয়দ আহাম্মদ

সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ একদিন কেড়ে নিয়েছিল এক জেলেকে। পরিবার ধরে নিয়েছিল, তিনি আর বেঁচে নেই। সময়ের স্রোতে ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল স্মৃতি। কিন্তু ভাগ্যের বিস্ময়কর পরিহাস—৫৪ বছর পর হঠাৎই গ্রামের একটি বাজারে এসে দাঁড়ালেন সেই মানুষটি। প্রথমে কেউ চিনতে পারেনি, কিন্তু নিজের পরিচয় জানাতেই স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো গ্রাম।

নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার পৌরসভা ৫ নম্বর ওয়ার্ডের এমপির পুল সংলগ্ন ফজলি বাড়িতে ঘটেছে এই অবিশ্বাস্য ঘটনা। ফিরে আসা মানুষটির নাম ছৈয়দ আহাম্মদ (মৃত ধন মিয়ার ছেলে)। বয়সের ভার, অসুস্থতা, গলায় অপারেশনের দাগ—সবকিছু সত্ত্বেও তার চোখেমুখে ফুটে উঠেছে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আপন ঠিকানায় ফেরার শান্তি।

স্বজনদের তথ্যমতে, প্রায় ৫৪ বছর আগে কুতুবদিয়া এলাকায় মাছ ধরার সময় ভয়াবহ ট্রলারডুবিতে নিখোঁজ হন তিনি। উত্তাল সাগরে মুহূর্তেই ছিটকে পড়েন জেলেরা। কেউ ফিরে এলেও ছৈয়দ আহাম্মদের আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। অনেক অনুসন্ধানের পর পরিবার ধরে নেয়, তিনি আর বেঁচে নেই। সে সময় তার স্ত্রী ছামনা খাতুনের কোলে ছিল ছোট্ট ছেলে আকরাম—যে বাবার মুখ না দেখেই বড় হয়েছে।

পরিবারের দাবি, ট্রলারডুবি থেকে কোনোভাবে খড়কুটো আঁকড়ে ভারতের অজ্ঞাত অঞ্চলে গিয়ে পৌঁছান ছৈয়দ আহাম্মদ। এরপর শুরু হয় তার দীর্ঘ অনিশ্চয়তার জীবন। বছর বছর কেটেছে বিভিন্ন মসজিদ, মাজার ও পথে-প্রান্তরে। দীর্ঘ সময় তিনি অবস্থান করেছেন ভারতে আজমীর শরীফ এলাকায়। সম্প্রতি হাওড়া স্টেশনে দুষ্কৃতকারীদের হাতে সর্বস্ব হারান। পরে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) আইনগত প্রক্রিয়া শেষে তাকে বাংলাদেশে প্রত্যাবাসন করে।

সেখান থেকে স্মৃতির টানে ধীরে ধীরে পথ খুঁজে চলতে চলতে শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যান হাতিয়ায় নিজের পৈতৃক বাড়িতে। গত মঙ্গলবার দুপুরে বাড়িতে এসে নিজের পরিচয় জানালে প্রথমে কেউ বিশ্বাস করেনি। পরে তার সহপাঠী মুন্সি সারেং, চাচাতো ভাই গেদু মিয়া, সহোদর আবুল খায়ের ওরফে জমিদারসহ কয়েকজন প্রবীণ তাকে শনাক্ত করেন।

খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি হয়। শত শত মানুষ ভিড় করেন এক নজর তাকে দেখতে—যে মানুষটিকে মৃত ভেবে ভুলে গিয়েছিল সময়।

স্থানীয় বাসিন্দা আলফাজ আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “এত বছর পর আল্লাহ তাকে জীবিত ফিরিয়ে দিয়েছেন—এটা আমাদের সবার জন্য আনন্দের খবর। মানুষটা যেন জীবনের শেষ সময়ে আপনজনের সান্নিধ্য পায়, এটিই কাম্য।”

৫৩ বছর বয়সী ছেলে আকরাম বাবার প্রত্যাবর্তনকে জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া বলে উল্লেখ করেন। আকরাম জানান, জন্মের পরপরই বাবা নিখোঁজ হন; এতদিন তিনি শুধু শুনে এসেছেন বাবার গল্প। বাবাকে নিয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরিও করেছেন তিনি। তবে প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে কিছু পারিবারিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেন আকরাম। তার দাবি, কয়েকজন স্বজন বাবার দায়িত্ব নিতে গড়িমসি করছেন এবং ছৈয়দ আহাম্মদের সঙ্গে থাকা অর্থ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় আলোচনার ঝড় বইছে। ৫৪ বছর তিনি কোথায় ছিলেন, কীভাবে দিন কাটিয়েছেন, কেন পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি—এইসব প্রশ্ন ঘুরছে চায়ের টেবিল থেকে শুরু করে গ্রাম্য আড্ডায়। কেউ বলছেন স্মৃতিভ্রংশ, কেউ বলছেন ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। আবার অনেকের ধারণা, জীবনের শেষ দিকে শেকড়ের টানেই ফিরে এসেছেন।

তবে রহস্যের ঘেরা নানা প্রশ্নের মধ্যেও একটি বিষয় স্পষ্ট—অবিশ্বাস্যভাবে হারিয়ে যাওয়া একজন মানুষকে ফিরে পাওয়ার আনন্দে আবেগে ভাসছেন তার স্বজনরা।

এ বিষয়ে হাতিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. কবির হোসেন বলেন, “৫৪ বছর পর একজন নিখোঁজ জেলে ফিরে আসার খবর পেয়েছি। এতে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। স্বজনরা আইনগত সহযোগিতা চাইলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন