শনিবার
০৭ মার্চ ২০২৬, ২৩ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
শনিবার
০৭ মার্চ ২০২৬, ২৩ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নার্সের বদলে আয়ার ইনজেকশন পুশ, ২৪ ঘণ্টার নবজাতকের মৃত্যু

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০৭ মার্চ ২০২৬, ০৫:৫৫ এএম
নিহত নবজাতক
expand
নিহত নবজাতক

হবিগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে নার্সের পরিবর্তে আয়া দিয়ে ইনজেকশন পুশ করানোর অভিযোগে জন্মের মাত্র ২৪ ঘণ্টার মাথায় এক নবজাতক পুত্রসন্তানের মৃত্যু হয়েছে। মর্মান্তিক এ ঘটনায় হাসপাতালে শোক ও উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। নবজাতকের স্বজনদের আহাজারিতে হাসপাতালের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে।

শুক্রবার (৬ মার্চ) রাত প্রায় ১০টার দিকে সদর হাসপাতালের শিশুদের স্ক্যানু (SCANU) ওয়ার্ডে গিয়ে এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা যায়। নিহত নবজাতকের পিতা বানিয়াচং উপজেলার ইসলামপুর গ্রামের বাসিন্দা ও পেশায় রাজমিস্ত্রি রফিক মিয়া। সন্তান হারানোর শোকে তিনি বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন।

শোকাহত রফিক মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, “আমার ছেলেটা জন্মের সময় একদম সুস্থ ছিল। কিন্তু হাসপাতালের অবহেলায় আমার সন্তানকে হারাতে হলো।”

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার দুপুরে রফিক মিয়ার স্ত্রী খাদিজা আক্তারের প্রসব ব্যথা ওঠে। পরে তাকে শহরের সেন্ট্রাল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে পিজি হাসপাতালের অধ্যাপিকা তৃপ্তি দাশের তত্ত্বাবধানে তার সিজারিয়ান অপারেশন করা হয়। অপারেশনের মাধ্যমে একটি ফুটফুটে পুত্রসন্তানের জন্ম হয়।

স্বজনদের দাবি, জন্মের সময় নবজাতকটি সম্পূর্ণ সুস্থ ছিল। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী কিছু ইনজেকশন দেওয়ার প্রয়োজন হওয়ায় শিশুটিকে পরে সদর হাসপাতালের শিশুদের স্ক্যানু ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়।

রফিক মিয়ার অভিযোগ, হাসপাতালে ভর্তি করার পর সারাদিন ও রাতভর নবজাতকটি সুস্থ অবস্থায় ছিল। কিন্তু শুক্রবার সন্ধ্যার দিকে এক আয়া নার্সের পরিবর্তে শিশুটিকে একসঙ্গে দুটি ইনজেকশন পুশ করেন। অভিযোগ রয়েছে, ইনজেকশন দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই নবজাতকের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়।

এ সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত রফিক মিয়া নিজের চোখের সামনে সন্তানের মৃত্যু দেখেও কিছু করতে না পারার অসহায়ত্বে ভেঙে পড়েন।

ঘটনার পরপরই হাসপাতাল এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। স্বজনরা ক্ষোভ প্রকাশ করলে কিছু সময়ের জন্য হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, অভিযুক্ত আয়া ঘটনাস্থল থেকে সটকে পড়েন। পরে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সদর হাসপাতালে এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। এর আগেও অনুরূপ অভিযোগ উঠলেও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে সংশ্লিষ্টদের অবহেলা ও দায়িত্বহীনতা দিন দিন বেড়ে চলেছে বলে দাবি তাদের।

হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, অনেক সময় চিকিৎসকের পরিবর্তে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা রোগীর প্রেসক্রিপশন লিখে দেন। একইভাবে নার্স বা ব্রাদারের দায়িত্ব থাকলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে ওয়ার্ড বয়, ঝাড়ুদার বা আয়া ইনজেকশন পুশসহ বিভিন্ন চিকিৎসাসংক্রান্ত কাজ করে থাকেন। এতে চিকিৎসা সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে এবং রোগীদের জীবনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত এক চিকিৎসক বলেন, নবজাতকের মৃত্যুর সঠিক কারণ এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ভুল চিকিৎসা বা ভুল ওষুধ প্রয়োগে মৃত্যু হয়েছে কিনা, তা তদন্ত ছাড়া বলা সম্ভব নয়। স্বজনরা অভিযোগ করতে পারেন, তবে প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত প্রয়োজন।

অন্যদিকে নবজাতকের পিতা রফিক মিয়া জানান, সন্তানের মৃত্যুর ঘটনায় তিনি আইনের আশ্রয় নেবেন এবং সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

মর্মান্তিক এ ঘটনার পর হাসপাতালের চিকিৎসা সেবার মান ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সাধারণ মানুষের দাবি, দ্রুত সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের হৃদয়বিদারক ঘটনা আর না ঘটে।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন