মঙ্গলবার
০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মঙ্গলবার
০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সময়ের দাবি একটি পৃথক-পূর্ণাঙ্গ মানবসম্পদ উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়

রোটারিয়ান মোঃ মাশেকুর রহমান খান, পিএইচএফ
প্রকাশ : ০৯ জুন ২০২৬, ০৩:৪৬ পিএম আপডেট : ০৯ জুন ২০২৬, ০৩:৫৭ পিএম
ছবি সংগৃহীত
expand
ছবি সংগৃহীত

বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের এক নতুন পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। অবকাঠামো, শিল্পায়ন, তথ্যপ্রযুক্তি, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করছে। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন আজ আমাদের সামনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—বাংলাদেশের উন্নয়নের পরবর্তী চালিকাশক্তি কী হবে?

আমার দৃঢ় বিশ্বাস, বাংলাদেশের আগামী দিনের উন্নয়নের মূল ভিত্তি হচ্ছে মানবসম্পদ। কারণ কোনো দেশের প্রকৃত শক্তি তার প্রাকৃতিক সম্পদে নয়, বরং তার দক্ষ, উৎপাদনশীল, উদ্ভাবনী এবং নৈতিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিহিত থাকে।

বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি। এর মধ্যে ১১ কোটিরও বেশি মানুষ কর্মক্ষম বয়সসীমার অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠী কর্মক্ষম। অর্থনীতিবিদরা একে "ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড" বা জনমিতিক সুবিধা বলে অভিহিত করেন। বিশ্বের বহু দেশ যখন শ্রমশক্তির ঘাটতি এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান চাপে ভুগছে, তখন বাংলাদেশ এখনও এই বিরল সুযোগের অধিকারী।

কিন্তু এই সুযোগ একটি দেশের জন্য চিরস্থায়ী থাকেনা। আগামী এক থেকে দুই দশকের মধ্যে বাংলাদেশের জনসংখ্যাও ধীরে ধীরে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর দিকে অগ্রসর হবে। ফলে বর্তমান সময়টিই আমাদের জন্য একটি “Golden Window of Opportunity”। এখনই যদি আমরা আমাদের যুবসমাজকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে না পারি, তাহলে এই সম্ভাবনা একসময় হারিয়ে যাবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী দেশে বেকারের সংখ্যা ২৬ লক্ষাধিক। এর মধ্যে প্রায় ৯ লক্ষ উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণী। উচ্চশিক্ষিতদের বেকারত্বের হার জাতীয় গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। অন্যদিকে দেশের বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি কোম্পানি এবং উৎপাদনমুখী শিল্প দক্ষ ও যোগ্য জনশক্তির অভাবে ভুগছে। অর্থাৎ একদিকে বেকারত্ব, অন্যদিকে দক্ষ জনশক্তির সংকট—এ এক বড় জাতীয় বৈপরীত্য।

এর অন্যতম কারণ শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিল্পখাতের চাহিদার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। এখনও আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় অংশ কর্মমুখী নয়। শিল্প-একাডেমিয়া সহযোগিতা সীমিত। বাস্তবভিত্তিক দক্ষতা, সফট স্কিল, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, কর্মসংস্থানযোগ্যতা এবং উৎপাদনশীলতার ওপর পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। ফলে অনেক প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তব কর্মক্ষেত্রের চাহিদার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারছে না।

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, বর্তমান সরকার এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্প-একাডেমিয়া সংযোগ এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে আসছেন। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA), বিভিন্ন Skills for Employment কর্মসূচি, কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণ এবং দক্ষতা উন্নয়নমূলক উদ্যোগ তারই প্রতিফলন। তবে এসব উদ্যোগকে আরও কার্যকর, সমন্বিত এবং ফলপ্রসূ করার জন্য একটি কেন্দ্রীয় ও শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রয়োজন।

বর্তমানে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, কারিগরি শিক্ষা বিভাগ, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, NSDA, BMET, BOESL, শিল্প মন্ত্রনালায় এর অধীনে ব আই এম এবং অন্যান্য সংস্থা মানবসম্পদ উন্নয়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে কাজ করছে। কিন্তু কার্যক্রমগুলো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিভক্ত থাকায় অনেক ক্ষেত্রে সমন্বয়, পরিকল্পনা এবং ফলাফল পরিমাপের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়।

বিশ্বের উন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো এই বাস্তবতা অনেক আগেই উপলব্ধি করেছে। সিঙ্গাপুরে Ministry of Manpower, মালয়েশিয়ায় Ministry of Human Resources, সংযুক্ত আরব আমিরাতে Ministry of Human Resources and Emiratisation, সৌদি আরবে Ministry of Human Resources and Social Development, দক্ষিণ কোরিয়ায় Ministry of Employment and Labor, ভারতে Ministry of Skill Development and Entrepreneurship এবং শ্রীলঙ্কায় দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানভিত্তিক পৃথক কাঠামো জাতীয় উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্সের অবদান অসামান্য। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আনুমানিক দেড় কোটিরও বেশি বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ রেকর্ড পরিমাণ ৩২.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স অর্জন করেছে এবং চলতি অর্থবছরে এ প্রবাহ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বৈদেশিক আয় দেশের অর্থনীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিনিয়োগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং গ্রামীণ উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।

তবে বাস্তবতা হলো, বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের একটি বড় অংশ এখনও স্বল্প দক্ষ বা অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। ফলে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে তাদের আয় ও মূল্য সংযোজন সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। অন্যদিকে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে দক্ষ কেয়ারগিভার, স্বাস্থ্যসেবা কর্মী, ওয়েল্ডার, ইলেকট্রিশিয়ান, মেকাট্রনিক্স টেকনিশিয়ান, আইটি বিশেষজ্ঞ এবং প্রযুক্তিগত কর্মীদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

যদি বাংলাদেশ পরিকল্পিতভাবে ভাষা শিক্ষা, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন দক্ষতা প্রশিক্ষণ, সার্টিফিকেশন এবং চাহিদাভিত্তিক মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে দক্ষ কর্মী তৈরি ও প্রেরণ করতে পারে, তাহলে আগামী এক দশকে রেমিট্যান্স আয় ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা তারও বেশি পর্যায়ে উন্নীত হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে “Bangladesh Skilled Workforce” নামে বিশ্ববাজারে একটি শক্তিশালী জাতীয় ব্র্যান্ড গড়ে উঠবে।

এই বাস্তবতার আলোকে সময় এসেছে একটি পৃথক ও পূর্ণাঙ্গ “মানবসম্পদ উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়” প্রতিষ্ঠার। এই মন্ত্রণালয় জাতীয় মানবসম্পদ পরিকল্পনা, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, শিল্প-একাডেমিয়া সহযোগিতা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, বৈদেশিক কর্মসংস্থান, ভবিষ্যৎ দক্ষতা চাহিদা নিরূপণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লব উপযোগী জনশক্তি প্রস্তুতকরণ এবং জাতীয় প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়গুলোকে সমন্বিতভাবে পরিচালনা করতে পারে।

বাংলাদেশে কৃষির জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়, শিল্পের জন্য শিল্প মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্যখাতের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় রয়েছে। কিন্তু দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ—মানুষের উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং উৎপাদনশীলতা উন্নয়নের জন্য এখনও কোনো স্বতন্ত্র ও পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রণালয় নেই।

বাংলাদেশের সামনে আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন অবকাঠামো নয়, মানবসম্পদ; সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ প্রকল্প ভবন নয়, মানুষ; এবং সবচেয়ে বড় উন্নয়ন কৌশল হলো দক্ষ, উৎপাদনশীল, উদ্ভাবনী ও বিশ্বমানের জনশক্তি তৈরি করা।

আমার বিশ্বাস, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী নেতৃত্বে যদি একটি পৃথক ও পূর্ণাঙ্গ মানবসম্পদ উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে বাংলাদেশ তার ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডকে প্রকৃত অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে সক্ষম হবে। এটি শুধু কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করবে না; বরং উৎপাদনশীলতা, রেমিট্যান্স, শিল্পায়ন, বৈদেশিক বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং জাতীয় প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি উন্নত, দক্ষ ও সমৃদ্ধ জাতিতে পরিণত করার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

কারণ আগামী দিনের বিশ্বে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হবে না প্রাকৃতিক সম্পদ—সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হবে দক্ষ, সৃজনশীল, উদ্ভাবনী এবং বিশ্বমানের মানবসম্পদ।

আজকের যুবশক্তিকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করাই আগামী দিনের রেমিট্যান্স, শিল্পায়ন, বিনিয়োগ, উদ্ভাবন, উৎপাদনশীলতা এবং জাতীয় সমৃদ্ধির সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি। বাংলাদেশের উন্নয়নের পরবর্তী অধ্যায় হবে Human Resource Driven Development। আর একটি পৃথক ও পূর্ণাঙ্গ মানবসম্পদ উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ই হতে পারে সেই রূপান্তরমূলক যাত্রার প্রধান চালিকাশক্তি—যা বাংলাদেশের জনসংখ্যাকে বোঝা নয়, বরং বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী মানবসম্পদে পরিণত করবে। লেখক: রোটারিয়ান মোঃ মাশেকুর রহমান খান, পিএইচএফ। সভাপতি, বাংলাদেশ সোসাইটি ফর হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট (BSHRM), বোর্ড মেম্বার ও পরিচালক, এশিয়া প্যাসিফিক ফেডারেশন অব হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট (APFHRM)।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন