

ভারতের সঙ্গে শেখ হাসিনার করা গোপন চুক্তির বিষয়ে জনমনে ব্যাপক কৌতূহল ও আগ্রহ আছে। ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক ও রাজনীতিবিদসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিকরা চাইছেন প্রকাশ হোক, আলোচনা-পর্যালোচনা হোক। তবুও পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে ভারতের সঙ্গে করা চুক্তিগুলো প্রকাশের উদ্যোগ নেই।
গদি টিকিয়ে রাখার বিনিময়ে দেশের স্বার্থ বিলিয়ে স্বাক্ষরিত এসব চুক্তি নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল তখনই। অভিযোগ রয়েছে, দিল্লির চাওয়া-পাওয়াকে প্রাধান্য দিয়ে চুক্তির ধারা-উপধারা সাজানো হয়। বেশকিছু চুক্তি হয়েছে একপেশে। এতে বাংলাদেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে ভারতের স্বার্থকে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দুই বছর পেরিয়ে গেলেও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়গুলোর কোনো প্রতিকার মিলছে না।
জানা গেছে, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনামলে ভারতের সঙ্গে অন্তত ২০টি চুক্তি এবং ৬৬টি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। ভারতকে একতরফা সুবিধা দিয়ে করা ট্রানজিট, ট্রানশিপমেন্ট, রেল করিডোর, বিদ্যুৎ আমদানি, ভারতীয় টিভি চ্যানেলের সম্প্রচারসহ তথ্য আদান-প্রদান, বন্দর ব্যবহার, চট্টগ্রামের মিরসরাইতে ১৬শ একর জমি প্রদানসহ বেশ কয়েকটি চুক্তিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সব চুক্তিতেই বাংলাদেশের স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া হয়েছে। চুক্তিগুলোতে দেশের স্বার্থ উপেক্ষিত হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরাও অভিমত দিয়েছেন। আর সরকারের নীতিনির্ধারকরা চুক্তিগুলো সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পর্যালোচনা করার কথা জানিয়েছেন।
‘ভারতকে আমি যা দিয়েছি, তারা সেটি সারা জীবন মনে রাখবে’Ñশেখ হাসিনার এমন উক্তি ভারতের প্রতি তার দায়বদ্ধতার প্রমাণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, শেখ হাসিনা ভারতের সমর্থন নিয়েই বিনা ভোটে সাড়ে ১৫ বছর ধরে দেশে তার চরম স্বৈরশাসন চালিয়েছেন। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পদত্যাগ করে তিনি পালিয়ে আশ্রয় পান সীমান্তে বেড়া নির্মাণে গোপন ৪ চুক্তি
দুই দেশের সীমান্তে শূন্য রেখার ভেতরে অবৈধভাবে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য ২০১০ সালে শেখ হাসিনা ভারতের প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছেন। পরবর্তী সময়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে এ বিষয়ে চারটি সমঝোতা স্মারকে সই হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চার হাজার ১৫৬ কিলোমিটার (কিমি) সীমান্তের তিন হাজার ২৭১ কিমি এলাকাতেই ভারত অবৈধভাবে কাঁটাতারের বেড়া তৈরির কাজ শেষ করেছে। আন্তর্জাতিক আইন ও রীতি ভঙ্গ করে ২০১০ সালে শুরু করে ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার পতনের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত এ বেড়া নির্মাণের কাজ চলে।
অবশিষ্ট ৮৮৫ কিমি এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণে দেশটি সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছে বলে ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) বাধা দিতে গেলে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) শেখ হাসিনার আমলের চুক্তিগুলোর রেফারেন্স দিচ্ছে। মাঝে-মধ্যে গোলাগুলির ঘটনাও ঘটছে বলে জানান ওই কর্মকর্তা। অসম এসব সমঝোতা স্মারক বাতিলের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও তা কার্যকর হয়নি বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।
বাংলাদেশ-ভারত যুগ্ম-সীমান্ত নির্দেশাবলি-১৯৭৫ অনুযায়ী, উভয় দেশের শূন্যরেখার ১৫০ গজের মধ্যে প্রতিরক্ষা সংবলিত যে কোনো কাজ সম্পন্নের বিষয়ে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এছাড়া উভয় দেশের প্রয়োজনে শূন্যরেখা থেকে ১৫০ গজের মধ্যে যে কোনো উন্নয়নমূলক কাজ করার ক্ষেত্রে একে অপরের সম্মতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
সিঙ্গাপুর হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে ট্রানজিট
বিতর্কিত ১/১১ সরকারের হাত ধরে ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা সরকার গঠনের পরপরই ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসে। ওই সরকারের মন্ত্রী ও আমলাদের মুখে মুখে ছিল ভারতকে ট্রানজিট দিলে বাংলাদেশ হয়ে উঠবে সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক, দুবাইয়ের মতো। সরকারের কেউ কেউ তখন বাংলাদেশ ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলোর মতো হবে বলেও প্রচার করেন।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ২০১০ সালের চুক্তির আওতায় ২০১৫ সালে ভারতের সঙ্গে আরো একটি প্রটোকল সই হয়। এ প্রটোকলের মাধ্যমে ভারতকে বাংলাদেশের চারটি নদীপথ ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়। এতে কলকাতা ও মুর্শিদাবাদকে বাংলাদেশের পূর্বে আসাম, ত্রিপুরা ও মেঘালয়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করার সুযোগ পায় ভারত।
আইন মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে প্রটোকলের খসড়া ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলে এতে বাংলাদেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হওয়ার কথা বলে তৎকালীন আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ আপত্তি তুলে প্রস্তাব ফেরত পাঠান। পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ভারতকে ট্রানজিট দেওয়ার চুক্তির পক্ষে মত দিতে বাধ্য হয় আইন মন্ত্রণালয়। এ নৌ-প্রটোকলের পাশাপাশি ভারত পরবর্তী সময়ে সড়ক ট্রানজিট ও রেল করিডোরও আদায় করে নেয়।
ভারতকে ট্রানজিট দেওয়ার বিষয়ে ওই সময় বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল প্রবল আপত্তি জানায়। সিলেটে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর নেতৃত্বে ট্রানজিটবিরোধী তীব্র আন্দোলন হয়। আশুগঞ্জ নদীবন্দর অভিমুখে ঢাকা থেকে লংমার্চও হয়। এরপরই ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল ইলিয়াস আলী গুমের শিকার হন। রাজনৈতিক মহলের দাবি, ভারতকে একতরফা ট্রানজিট দেওয়ার বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ায় ওই সময় দুই দেশের সরকারের টার্গেটে পরিণত হয়েছিলেন তিনি।
চট্টগ্রাম ও মোংলাবন্দর ব্যবহারের অনুমতি
সূত্র জানিয়েছে, ২০১৫ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পণ্য পরিবহন সংক্রান্ত প্রটোকল সই হয়। এ প্রটোকলের আওতায় ২০১৮ সালের অক্টোবরে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী, চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দরে পৌঁছানো পণ্যসমূহ বাংলাদেশের ভূখণ্ডের ভেতর দিয়ে সড়ক, রেল ও জলপথে আখাউড়া হয়ে ত্রিপুরা, তামাবিল হয়ে মেঘালয় এবং সুতারকান্দি হয়ে আসামে এবং বিবিরবাজার হয়ে সীমান্তপুরে (আসাম) আনা-নেওয়া করতে পারবে।
২০২৩ সালের ২৫ এপ্রিল ভারতকে চট্টগ্রাম ও মোংলাবন্দর ব্যবহারের চূড়ান্ত অনুমতি দিয়ে এনবিআর প্রজ্ঞাপন জারি করে। এর ফলে ভারত বন্দর দুটি ব্যবহার করে নিজ দেশে পণ্য পরিবহনের সুযোগ পায়। পরে পণ্য পরিবহনে চট্টগ্রাম-আখাউড়া-আগরতলা, মোংলা-আখাউড়া-আগরতলা, তামাবিল-ডাউকি, শেওলা-সুতারকান্দি ও বিবিরবাজার-সীমান্তপুর রুটে ১৬টি ট্রানজিট রুট খোলা হয়।
দিতে হচ্ছে ফেনী নদীর পানি
২০১৯ সালের অক্টোবরে শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি হবে— এমন অঙ্গীকার করে উভয় দেশ। কিন্তু সফরে তিস্তাচুক্তির খসড়া তো দূরের কথা আন্তর্জাতিক এ নদীর পানির প্রবাহের কথাটিই ওঠেনি। উল্টো বাংলাদেশের নিজস্ব নদী ফেনীর পানি চেয়ে বসে ভারত। বৈঠকে নরেন্দ্র মোদির আবদার ফেলতে পারেননি হাসিনা। দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ ভারতকে এক দশমিক ৮২ কিউসেক পানি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। এ চুক্তির আগে শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদ ও মন্ত্রিসভার অনুমোদন নেননি বলে অভিযোগ ওঠে। পানি বিশেষজ্ঞরাসহ দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠন এ চুক্তির তীব্র সমালোচনা করে।
চুক্তির পর দেশে ফিরে হাসিনা সংবাদ সম্মেলন করে সমালোচনার জবাব দেন। ভারতকে ফেনী নদীর পানি দেওয়ার পক্ষে সাফাই গেয়ে হাসিনা বলেন, ‘ত্রিপুরার মানুষকে কিছু পানি খাওয়ার জন্য দিচ্ছি। এ বিশাল নদীর কিছু পানি ভারতকে দেওয়ার ফলে এত চিৎকার করা হচ্ছে কেন? ভারত পান করার জন্য কিছু পানি চেয়েছে, আমরা দিয়েছি।’
বাংলাদেশ ছিল ভারতের উন্মুক্ত বাজার
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ভারত তাদের ৩৬০টি পণ্য বাংলাদেশে রপ্তানির সুযোগ পাচ্ছে। এর মধ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা পায় ১৩৫টি পণ্য। অন্যদিকে কাগজ-কলমে বাংলাদেশ ৩৬টি পণ্য রপ্তানির সুবিধা পেলেও বাস্তবে হাতেগোনা কয়েকটি পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৭১৬০ মিলিয়ন ডলার। এমন বাণিজ্যঘাটতি বিশ্বে বিরল ঘটনা বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, বাংলাদেশ ভারতের একটি উন্মুক্ত বাজারে পরিণত হয়েছিল গত ১৫ বছরে।
বিদ্যুৎ আমদানিতে মাসে ক্ষতি ৭০০ কোটি টাকা
শেখ হাসিনা ২০১৭ সালে নয়াদিল্লিতে ভারতের আদানি পাওয়ারের সঙ্গে চূড়ান্ত বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি (পিপিএ) স্বাক্ষর করেন। চুক্তির বিষয়ে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান, বর্তমানে প্রতি মাসে প্রায় অতিরিক্ত ৭০০ কোটি টাকা গচ্চা দিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।
বাংলাদেশের আশীর্বাদপুষ্ট ভারতের রেমিট্যান্স
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে কর্মরত বিদেশিরা ৯ কোটি ৪০ লাখ ডলারের সমপরিমাণ অর্থ নিজ দেশে পাঠিয়েছেন। ২০২১-২২ অর্থবছরে যা দাঁড়ায় ১১ কোটি ৫০ লাখ ডলারে। আর এই টাকা পাঠানোর দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে ভারতীয়রা। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চার কোটি ৪০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স গেছে ভারতে, যা দেশের বাইরে যাওয়া রেমিট্যান্সের মধ্যে সর্বোচ্চ।
ভারতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সমঝোতা স্মারক
২০১৪ সালে হাসিনা টানা দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসার পরপরই ভারতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তির উদ্যোগ নেন। এ ধরনের চুক্তি হলে বাংলাদেশ সিকিম ও হায়দারাবাদের মতোই স্বাধীনতা হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিভিন্ন মহলের আপত্তি ও প্রতিবাদ উপেক্ষা করেই হাসিনা অত্যন্ত গোপনে ভারতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সমঝোতা স্মারক সই করেন।
প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয়চুক্তি
আগের সমঝোতা স্মারকের সূত্র ধরে ভারতের সঙ্গে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয়চুক্তি সই করে বাংলাদেশ। ভারতের সঙ্গে অত্যন্ত গোপনে এ চুক্তি হয় বলে অভিযোগ ওঠে। চুক্তির পর ২০২২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে ভারতের প্রতিরক্ষা সচিব বিনয় মোহন কাত্রা সাংবাদিকদের সামনে তা প্রকাশ করেন।
ভারতের স্বার্থ রক্ষায় রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের তথ্যমতে, ভারতের ন্যাশনাল থারমাল পাওয়ার করপোরেশন (এনটিপিসি) ছত্তিশগড়ে ১৩২০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছিল। সেই দেশের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের গ্রিন প্যানেলের ইআইএ রিপোর্ট প্রকল্পটিকে পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি বলে প্রতিবেদন দাখিল করায় ভারত সরকার এ প্রকল্পটি সে দেশের পরিবর্তে বাংলাদেশে করার প্রস্তাব করে।
২০১০ সালের জানুয়ারিতে শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় এ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বাংলাদেশে করার বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। তীব্র প্রতিবাদ উপেক্ষা করে ২০২২ সালের শেষদিকে এ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু করা হলেও কারিগরি ত্রুটি, কয়লা-সংকট ও অন্যান্য কারণে এখন পর্যন্ত মোট সাতবার বন্ধ হয়ে যায়।
বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালুর আগে সরেজমিনে দেখা গেছে, এটির নির্মাণশ্রমিক থেকে শুরু করে কারিগরি কাজে যুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন ভারতীয়। কিছুসংখ্যক ছিলেন বাংলাদেশের। ভারতীয়রা আসবাবপত্র থেকে শুরু করে দৈনন্দিন প্রয়োজনে সবকিছুই ভারত থেকে আমদানি করেন বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা।
আদানির হাতে ‘মিরসরাই’ বিসর্জন
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) সূত্র জানায়, ২০১৫ সালে নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরকালে শীর্ষ বৈঠকে বাংলাদেশে একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল করার প্রস্তাব দেয় ভারত। এরপর ২০১৭ সালে হাসিনা ভারতের বিশেষ আমন্ত্রণে দিল্লি সফর করেন। ওই সময় দুদেশের প্রধানমন্ত্রীর শীর্ষ বৈঠকে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে ভারতের আদানি গ্রুপকে এক হাজার ৫৫ একর জমি দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে বাংলাদেশ ৯০০ একর জমি দিতে সম্মতি দিয়ে আসে।
বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলতে ২০১৯ সালের অক্টোবরে আদানি বন্দর ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের (আদানি পোর্টস অ্যান্ড এসইজেড) সঙ্গে বেজা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। ২০২২ সালের এপ্রিলে তারা এজন্য জয়েন্ট ভেঞ্চার (জেভি) গড়ে তোলার শর্তে আরেকটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। এ চুক্তির আওতায় একই এলাকায় আরো সাতশ একর জমি বরাদ্দের প্রক্রিয়াও চূড়ান্ত করা হয়।
চুক্তি পর্যালোচনার দাবি
ভারতের সঙ্গে করা সব চুক্তিই জাতির সামনে উপস্থাপন করা প্রয়োজন বলে জানান বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ভারতের সঙ্গে করা সব চুক্তি ও শর্তগুলো তো প্রকাশ করেনি। আমরা সংস্কার কমিশনে জানিয়েছিলাম, যে কোনো চুক্তির শর্তগুলো সংসদে জানাতে হবে। কিন্তু সরকার চুক্তি ও শর্তগুলো গোপন রাখে। জনগণ এসব বিষয়ে জানতে পারে না। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও বাণিজ্য চুক্তির শর্তগুলো প্রকাশ করা হয়নি।
তিনি বলেন, আমরা জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তির বিরুদ্ধে। সাম্য ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে কোনো চুক্তি হলে তাতে আমাদের সমর্থন থাকবে। বর্তমান সরকারের দায়িত্ব হলো— আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে যেসব চুক্তি হয়েছে, তা প্রকাশ ও সংসদে আলোচনা করা।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ইমরান সালেহ প্রিন্স গণমাধ্যমকে বলেন, সরকার অবশ্যই দেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করবে। অসম গঙ্গাচুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হবে। ভবিষ্যতে এই চুক্তি নবায়ন হতে হলে অবশ্যই দুই পক্ষের যৌক্তিকভাবে লাভবান হতে হবে। ইতোমধ্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই চুক্তি নবায়নের জন্য কারিগরি টিম গঠন করেছেন। আশা করব, অতীতের অসম চুক্তি যেমন পর্যালোচনা হবে, তেমনি আগামীতে কোনো চুক্তি হলে তা যেন দুই দেশের স্বার্থ ‘উইন উইন’ থাকে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার গণমাধ্যমকে বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী সব চুক্তির পুনর্মূল্যায়ন করে বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
ভারতের সঙ্গে করা চুক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, যে এগ্রিমেন্টগুলো হয়ে গেছে, তা থেকে যে বেরিয়ে যাওয়া যাবে না তা নয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই আইনি বাধ্যবাধকতা এতটাই কঠোর থাকে যে, বেরিয়ে যাওয়াটা বেশি ক্ষতিকর হতে পারে।
চুক্তিগুলো প্রকাশের বিষয়ে তিনি বলেন, কোনো কোনো চুক্তির কিছু অংশ গোপন রাখার শর্তও থাকে। যদিও জনগণের জানার অধিকার রয়েছে এবং সংসদে উপস্থাপনের সাংবিধানিক বিধানও আছে।
তিনি আরো বলেন, জনগণের জন্য ক্ষতিকর চুক্তি আগে যেগুলো হয়েছে, সরকার সেগুলোর মূল্যায়ন করবে। এর মধ্যে সমঝোতা স্মারকও থাকতে পারে, যেগুলো থেকে বেরিয়ে আসা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু এগ্রিমেন্টের ক্ষেত্রে বিষয়টি এতটা সহজ নয়। তারপরও আমরা অবশ্যই মূল্যায়ন করব।
সূত্র: আমার দেশ