

সম্পাদকঃ মোঃ আল হাদী
৪১৬ তোপখানা রোড, শিশু কল্যাণ পরিষদ, ঢাকা, বাংলাদেশ
টেলিফোনঃ +৮৮(০২) ৫৮৩১২৯৫৮, ৫৮৩১২৮২২ফেক্সঃ ৫৮৩১২৯৮১[email protected]


টানা তিন মাসের দীর্ঘ সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষে অবশেষে আজ থেকে উন্মুক্ত হলো বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন। সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গত ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সব ধরনের প্রবেশাধিকার বন্ধ ছিল।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) দীর্ঘ প্রতীক্ষা শেষে নদী-খালে মাছ ও কাঁকড়া ধরতে নামছেন সুন্দরবন উপকূলের হাজার হাজার জেলে। পাশাপাশি সুন্দরবনের নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে আবারও ফিরছেন দেশি-বিদেশি পর্যটকরা।
তবে বনে ফেরার এই আনন্দের আনন্দের মাঝে ঘন কালো মেঘ হয়ে নেমে এসেছে জলদস্যু বাহিনীর বেপরোয়া তাণ্ডব ও চাঁদা আদায়। বনে প্রবেশের আগেই দস্যুদের দাবি করা চাঁদা পরিশোধ করতে গিয়ে উপকূলজুড়ে নেমে এসেছে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক।
সরেজমিন সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ সংলগ্ন গাবুরা এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বনজীবীরা তাদের নৌকা ও জাল প্রস্তুত করে বনমুখী হওয়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়েছেন। তবে প্রতিটি জেলের চোখ-মুখে স্পষ্ট তাণ্ডবের ছাপ। বনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাতক্ষীরা অঞ্চলকেন্দ্রিক বর্তমানে অন্তত তিনটি জলদস্যু বাহিনী তাদের এলাকা ভাগ করে বনজুড়ে রাজত্ব চালাচ্ছে। তারা হলেন, বড় জাহাঙ্গীর', 'দয়াল-নানা ভাই ওরফে ডন আনারুল' এবং 'মঞ্জু ও দুলাভাই বাহিনী'। এই তিন বাহিনীতে বর্তমানে প্রায় ১২০ থেকে ১৪০ জন সশস্ত্র সদস্য রয়েছে, যারা সুন্দরবনের ভেতরে নিজেদের মধ্যে এলাকা ভাগ করে তাণ্ডব চালাচ্ছে।
দস্যুদের বেঁধে দেওয়া নিয়ম অনুযায়ী সুন্দরবনে ঢোকার আগেই প্রতিটি দস্যু বাহিনীকে নৌকা প্রতি ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা করে চাঁদা দিতে হচ্ছে। ফলে বন বিভাগের সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে সুন্দরবনে প্রবেশের অনুমতি পেতে একটি নৌকাকে তিন বাহিনী মিলিয়ে দিতে হচ্ছে মোট ৭৫ থেকে ৯০ হাজার টাকা। আর কোনো জেলে চাঁদা না দিয়ে বনে নামার দুঃসাহস দেখালে তাকে জিম্মি করে আদায় করা হচ্ছে দ্বিগুণ মুক্তিপণ।
বন বিভাগ সূত্র জানায়, সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জে মাছ ও কাঁকড়া ধরার জন্য রেজিস্টার্ড বিএলসি (বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট) রয়েছে প্রায় ২ হাজার ৯০০টি। প্রতি নৌকায় দুই থেকে তিনজন করে জেলে ধাপে ধাপে বনের নদী-নালায় প্রবেশ করবেন। সেই হিসাবে সব মিলিয়ে প্রায় ৯ হাজার জেলের জীবিকা নির্ভর করছে এই সুন্দরবনের ওপর। তবে দস্যুদের ভয়ে উপকূলে কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস করছেন না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন বনজীবী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ঋণের টাকা নিয়ে দস্যুদের পকেট ভারী করে তবেই তাদের জীবিকার তাগিদে বনে নামতে হচ্ছে।
তবে বনজীবীদের নিরাপত্তা ও বনের অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। প্রশাসন সূত্রে জানানো হয়েছে, পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশ। এছাড়া জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং দস্যুদের অপতৎপরতা রুখতে কোস্টগার্ডের পাশাপাশি বন বিভাগের 'স্মার্ট পেট্রোলিং' টিম ও বনকর্মীরা সুন্দরবনের গহীনে নিয়মিত টহল জোরদার রাখবে।
সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মো. মশিউর রহমান জানান, সব ধরনের আইনি প্রক্রিয়া মেনে বন বিভাগ থেকে অনুমতিপত্র নিয়ে জেলেদের বনে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। বনের ভেতরে যেকোনো ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড রোধে জেলেদের সজাগ করা হচ্ছে। বিশেষ করে বিষ দিয়ে মাছ শিকার কিংবা হরিণ শিকারের মতো অপরাধে কেউ জড়িত হলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


