রবিবার
২৪ মে ২০২৬, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
রবিবার
২৪ মে ২০২৬, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দেশের ৬০% মানুষের অগ্নিদগ্ধদের সেবায় প্রাথমিক চিকিৎসার জ্ঞান নেই: গবেষণা

খুলনা প্রতিনিধি
প্রকাশ : ২৪ মে ২০২৬, ০৪:৪৯ পিএম
খুলনা প্রেসক্লাবের কনফারেন্স হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলন
expand
খুলনা প্রেসক্লাবের কনফারেন্স হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলন

বাংলাদেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন নীতিমালা থাকলেও বাস্তব প্রস্তুতি ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে রয়েছে বড় ধরনের ঘাটতি। বিশেষ করে অগ্নিকাণ্ড এবং বহুমাত্রিক আঘাতজনিত (বার্ন ও পলিট্রমা) জরুরি পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের সচেতনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায় গুরুতর দুর্বলতা রয়েছে বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে।

রোববার খুলনা প্রেসক্লাবের কনফারেন্স হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়।

বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল (বিএমআরসি)-এর সহযোগিতা ও তত্ত্বাবধানে খুলনার একটি স্বাস্থ্য গবেষণা কেন্দ্র পরিচালিত “বাংলাদেশে গণদগ্ধ ও বহুমাত্রিক আঘাতজনিত জরুরি অবস্থার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ও সার্বিক ব্যবস্থাপনা” শীর্ষক গবেষণার ফলাফল প্রকাশ উপলক্ষে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে গবেষণার ফলাফল তুলে ধরেন গবেষণার প্রিন্সিপাল ইনভেস্টিগেটর ও সেন্টারের প্রোগ্রাম হেড অধ্যাপক ডা. বঙ্গ কমল বসু।

তিনি জানান, ঢাকা ও খুলনা সিটি করপোরেশন এলাকা, মোংলা, সাভার এবং আশুলিয়ার মতো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পাঞ্চল থেকে গবেষণার তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষের কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক ফার্স্ট এইড (প্রাথমিক চিকিৎসা) প্রশিক্ষণ নেই। এছাড়া ৬২ শতাংশের বেশি মানুষ অগ্নিদগ্ধ রোগী পরিবহনের সময় রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে অবগত নন।

গবেষণায় আরও দেখা যায়, পুড়ে যাওয়া স্থানে টুথপেস্ট, তেল বা বরফ লাগানোর মতো ক্ষতিকর ও বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল ধারণা এখনো মানুষের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে। একই সঙ্গে শ্বাসনালি দগ্ধতার ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক করণীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত চিকিৎসা নির্দেশনা অনুযায়ী রোগী ব্যবস্থাপনা সম্পর্কেও অধিকাংশ মানুষের ধারণা সীমিত। ফলে জরুরি পরিস্থিতিতে রোগীর মৃত্যুঝুঁকি আরও বেড়ে যাচ্ছে।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কাগজে-কলমে প্রস্তুতি থাকলেও কমিউনিটি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। সরকারি উদ্যোগ থাকলেও প্রচারের অভাবে ফায়ার সার্ভিসের জরুরি হটলাইন নম্বর ১০২ সম্পর্কেও সাধারণ মানুষের সচেতনতা খুবই কম।

গবেষণার প্রিন্সিপাল কম্পোনেন্ট অ্যানালাইসিস অনুযায়ী, দুর্যোগ মোকাবিলায় সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো কমিউনিটি পর্যায়ের সামাজিক সক্ষমতার অভাব, যা সামগ্রিক সমস্যার মধ্যে সর্বোচ্চ ২৭ দশমিক ২ শতাংশ গুরুত্ব বহন করে। এছাড়া বেসরকারি হাসপাতালের সীমিত সক্ষমতা এবং সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিভিন্ন সীমাবদ্ধতাও জরুরি চিকিৎসাসেবা প্রদানে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়, বিভিন্ন উদ্ধারকারী সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা ও তথ্য আদান-প্রদানে বিলম্বের কারণে রোগী স্থানান্তর এবং দ্রুত চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য গবেষকরা সরকারের কাছে একটি সমন্বিত দুর্যোগ প্রস্তুতি ও জরুরি সাড়া ব্যবস্থাপনা মডেল বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছেন।

সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে— স্থানীয় পর্যায়ে শিল্পাঞ্চল ও হাসপাতালের সক্ষমতার মানচিত্র তৈরি, ফায়ার সার্ভিস ও অ্যাম্বুলেন্স চলাচলের জন্য সড়কে ‘গ্রিন করিডোর’ চালু, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ফায়ার হাইড্রেন্ট স্থাপন, হাসপাতালগুলোতে ২৪ ঘণ্টার ইমার্জেন্সি রেসপন্স ইউনিট শক্তিশালীকরণ, স্ট্যান্ডার্ড ট্রায়াজ সিস্টেম চালু এবং স্কুল, কলেজ ও শিল্পাঞ্চলে নিয়মিত ফার্স্ট এইড প্রশিক্ষণ ও অগ্নি মহড়া বাধ্যতামূলক করা।

বক্তারা বলেন, দ্রুত নগরায়ন ও শিল্পায়নের ফলে দেশে অগ্নিকাণ্ড ও ভূমিকম্পের ঝুঁকি বাড়ছে। তাই এসব সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে নীতিগত পরিবর্তন আনা এখন সময়ের দাবি।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন