মঙ্গলবার
০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মঙ্গলবার
০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভ্রমণ শেষে আর ফেরা হয়নি ৭৪ জনের

শাহীন মাহমুদ রাসেল, কক্সবাজার
প্রকাশ : ০৯ জুন ২০২৬, ০২:৪১ পিএম
সংগৃহীত
expand
সংগৃহীত

নীল জলরাশি, বিস্তীর্ণ বালুচর আর দিগন্তজোড়া সৌন্দর্যের টানে প্রতিদিন হাজারো পর্যটক ছুটে আসেন বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে। পরিবার-পরিজন কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দময় কিছু মুহূর্ত কাটানোর স্বপ্ন নিয়েই তাদের এই আগমন। কিন্তু সেই আনন্দ ভ্রমণ অনেকের জন্যই শেষ হচ্ছে ট্র্যাজেডিতে। প্রতি বছর বাড়ছে সমুদ্রস্নান করতে নেমে স্রোতের টানে ভেসে যাওয়া, নিখোঁজ হওয়া এবং মৃত্যুর ঘটনা।

পরিসংখ্যান বলছে, গত ১২ বছরে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে প্রাণ হারিয়েছেন ৭৪ জন পর্যটক। জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ১ হাজার ২৫ জনকে। এখনও নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত দুইজন। শুধু ২০২৫ সালেই মারা গেছেন ২৫ পর্যটক। চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দুইজনে।

সচেতন মহলের প্রশ্ন, বিশ্বের দীর্ঘতম এই সমুদ্রসৈকতে প্রতিবছর লাখো পর্যটকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কতটা প্রস্তুত? একের পর এক প্রাণহানির ঘটনার পরও কার্যকর পদক্ষেপ না থাকলে, তাদের ভূমিকা কি শুধু দুর্ঘটনার পর লাশের সংখ্যা গোনাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে?

সরেজমিনে কক্সবাজারের সি-গাল পয়েন্টে গিয়ে দেখা যায়, বিপজ্জনক এলাকা চিহ্নিত করে লাল পতাকা টাঙানো হয়েছে। কিন্তু পর্যটকদের সতর্ক করার মতো কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই। নেই পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, নেই দৃশ্যমান লাইফগার্ডের উপস্থিতি।

প্রায় এক কিলোমিটারজুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থার এমন ঘাটতির মধ্যেই শত শত পর্যটক অবাধে সমুদ্রে নামছেন। অনেকে আবার সন্তানদের নিয়েও ঢেউয়ের মধ্যে নেমে পড়ছেন।

সি-সেইফ লাইফগার্ড সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত বছর শুধু সি-গাল পয়েন্টেই সমুদ্রস্নান করতে নেমে প্রাণ হারিয়েছেন ১২ জন পর্যটক। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বিপজ্জনক এলাকার চিহ্ন হিসেবে লাল পতাকা থাকলেও অধিকাংশ পর্যটক এর অর্থ ও গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন নন। ফলে বড় ঢেউ ও তীব্র স্রোতের মধ্যেও তারা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রবেশ করছেন।

সমুদ্রস্নানরত শরীয়তপুরের পর্যটক জীবন মোল্লা জানান, নিরাপদ ও অনিরাপদ এলাকা সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই ছিল না। তিনি বলেন, 'আমরা বান্দরবান ঘুরে সকালে সরাসরি কক্সবাজারে এসেছি। গাড়ি থেকে নেমেই সমুদ্রে নেমে পড়ি। কোথায় নামা নিরাপদ বা কোথায় ঝুঁকি আছে, সে বিষয়ে কেউ কিছু বলেনি।'

একই অভিযোগ করেন পর্যটক মো. লিংকন। তার ভাষ্য, সৈকতে পর্যাপ্ত সতর্কতা নেই। কোথায় নামা যাবে আর কোথায় যাবে না, সেটা বোঝার উপায়ও নেই। লাল পতাকা দেখেছি, কিন্তু অন্যদেরও সেখানে নামতে দেখে আমরাও নেমেছি।

ঢাকার মিরপুর থেকে আসা পর্যটক জ্যোতি রহমান বলেন, 'হোটেলে ওঠার সময়ও কোনো নিরাপত্তা নির্দেশনা দেওয়া হয় না। নতুন পর্যটকদের জন্য কোনো গাইডলাইন নেই। শুধু পতাকা টাঙিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে হবে না।'

রাজশাহী থেকে আসা পর্যটক আরিফুল ইসলাম বলেন, 'প্রথমবার কক্সবাজারে এসেছি। সমুদ্রের কাছে গিয়ে বুঝতেই পারিনি কোন জায়গাটা নিরাপদ আর কোনটা ঝুঁকিপূর্ণ। শুধু কয়েকটি লাল পতাকা দেখেছি, কিন্তু এগুলোর অর্থ কী বা কোথায় নামা যাবে না, সে বিষয়ে কাউকে বলতে শুনিনি। পর্যটকদের জন্য আরও স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা দরকার।'

গাজীপুর থেকে আসা পর্যটক তানিয়া আক্তার বলেন, 'আমি পরিবার নিয়ে এসেছি। ছোট ছোট বাচ্চারাও সমুদ্রে নামছে। কিন্তু আশপাশে পর্যাপ্ত লাইফগার্ড চোখে পড়েনি। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত সাহায্য পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে আমাদের মধ্যে ভয় কাজ করছে।'

নরসিংদী থেকে আসা পর্যটক মো. রুবেল হোসেন বলেন, 'সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই শুনি কক্সবাজারে পর্যটক ভেসে যাওয়ার খবর। কিন্তু এখানে এসে দেখলাম সচেতনতা তৈরির তেমন কোনো কার্যক্রম নেই। নিয়মিত মাইকিং ও নিরাপত্তা নির্দেশনা থাকলে মানুষ আরও সতর্ক হতো।'

কুমিল্লা থেকে আসা পর্যটক ফারজানা ইয়াসমিন বলেন, 'সমুদ্রের ঢেউ দেখলে অনেকেই উত্তেজিত হয়ে গভীর দিকে চলে যান। কিন্তু কোথা থেকে বিপদ শুরু হতে পারে, সেটা সাধারণ পর্যটকদের জানা থাকে না। তাই সৈকতের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড থাকা প্রয়োজন।'

মৃত্যুফাঁদে সি-গাল পয়েন্ট:

সি-গাল পয়েন্টে দায়িত্ব পালনকারী ছাতা (কিটকট) ব্যবসায়ী সুমন মুখার্জী জানান, এই পয়েন্টে প্রতি বছরই একাধিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

তিনি বলেন, 'গত বছরও ১০ জনের বেশি পর্যটক মারা গেছেন। কিন্তু এখানে কোনো লাইফগার্ড নেই। পর্যটকদের অনেক সময় নিষেধ করা হলেও তারা শোনেন না। দূরে চলে যান। তখন বিপদ হলে কিছুই করার থাকে না।'

স্থানীয়দের মতে, সৈকতের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলোর একটি হয়ে উঠেছে সি-গাল এলাকা। অথচ সেখানে স্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই।

লাখো পর্যটক, পাহারায় মাত্র কয়েকজন

কক্সবাজারের সুগন্ধা পয়েন্টে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে সমুদ্রস্নানে ব্যস্ত হাজার হাজার পর্যটক। অথচ তাদের নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র চারজন লাইফগার্ড।

একজন পর্যবেক্ষণ টাওয়ারে, বাকি তিনজন সৈকতজুড়ে টহল দিয়ে পর্যটকদের সতর্ক করার চেষ্টা করছেন। তাদের হাতেও নেই পর্যাপ্ত আধুনিক সরঞ্জাম। রয়েছে শুধু রেসকিউ টিউব এবং সীমিত সংখ্যক উদ্ধার নৌকা।

লাইফগার্ড কর্মীরা বলছেন, 'বর্তমান জনবল ও সরঞ্জাম দিয়ে বিপুল সংখ্যক পর্যটকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব।'

লাইফগার্ড কর্মী মো. সেলিম বলেন, 'স্বাভাবিক সময়েও প্রতিদিন ৫ থেকে ১০টি উদ্ধার অভিযান চালাতে হয়। বর্ষা মৌসুমে তা ১০ থেকে ১৫টিতে পৌঁছে যায়।'

সিনিয়র লাইফগার্ড জয়নাল আবেদীন ভূট্টো বলেন, 'প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ হাজার পর্যটক পানিতে নামছেন। অথচ আমাদের জনবল খুবই সীমিত। এই অবস্থায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।'

১২০ কিলোমিটারে, সুরক্ষায় মাত্র দেড় কিলোমিটার:

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের দৈর্ঘ্য প্রায় ১২০ কিলোমিটার। অথচ লাইফগার্ড সেবা সীমাবদ্ধ রয়েছে মাত্র লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টের ৫০০ মিটার করে মোট দেড় কিলোমিটার এলাকায়। অর্থাৎ বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের প্রায় পুরো অংশই রয়েছে কার্যকর উদ্ধারসেবার বাইরে।

বর্তমানে মোট ২৭ জন লাইফগার্ড কর্মী কাজ করছেন। প্রতি শিফটে দায়িত্ব পালন করেন মাত্র ১৮ জন। এই বিশাল পর্যটন এলাকায় বাকি অংশে নেই কোনো লাইফগার্ড সেবা কিংবা তাৎক্ষণিক উদ্ধার ব্যবস্থা।

আধুনিক সরঞ্জামের সংকট:

সি-সেইফ লাইফগার্ড সংস্থার সুপারভাইজার মো. সাইফুল্লাহ সিফাত বলেন, 'বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করতে হয়। আমাদের এখনও সাঁতার কেটে বা প্যাডেল চালিয়ে উদ্ধারকাজ করতে হয়। জেট স্কি কিংবা আধুনিক রেসকিউ সরঞ্জাম থাকলে অনেক দ্রুত উদ্ধার করা সম্ভব হতো।'

তিনি জানান, কক্সবাজারের তিনটি প্রধান সৈকতে কার্যকর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অন্তত ১০০ জনের বেশি প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড প্রয়োজন।

হোটেলগুলোও পালন করছে না দায়িত্ব কক্সবাজারে রয়েছে পাঁচ শতাধিক হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট ও গেস্ট হাউস। প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক এসব আবাসিক প্রতিষ্ঠানে অবস্থান করেন। কিন্তু অধিকাংশ হোটেলে সমুদ্রস্নান সংক্রান্ত কোনো নিরাপত্তা নির্দেশনা নেই। চেক-ইনের সময় পর্যটকদের দেওয়া হয় না কোনো নিরাপত্তা ব্রিফিং। কক্ষগুলোতেও থাকে না কোনো সতর্কতামূলক নির্দেশিকা।

হোটেল প্রাসাদ প্যারাডাইসের মহাব্যবস্থাপক মো. ইয়াকুব আলী বলেন, 'সরকারিভাবে একটি স্ট্যান্ডার্ড নিরাপত্তা নির্দেশিকা চালু করা হলে পর্যটকদের সচেতনতা বাড়বে।'

তিনি বলেন, 'নিয়মিত মাইকিং, সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড, হোটেলভিত্তিক নির্দেশিকা এবং মনিটরিং সেল গঠন করা জরুরি।'

তার মতে, দুর্ঘটনার দায় শুধু সরকারের নয়; হোটেল মালিক এবং পর্যটন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে।

সরকারি লাইফগার্ড বাহিনীর দাবি

বর্তমানে কক্সবাজারের লাইফগার্ড কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে একটি বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের মতো গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন এলাকায় সরকারি ব্যবস্থাপনায় স্থায়ী, প্রশিক্ষিত ও আধুনিক সরঞ্জামসমৃদ্ধ লাইফগার্ড বাহিনী গঠন করা এখন সময়ের দাবি।

সি-সেইফের প্রজেক্ট কর্মকর্তা মো. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, 'পর্যটকরা কক্সবাজারে আসার আগেই তাদের সচেতন করতে হবে। বাস, ট্রেন, বিমান, হোটেল এবং সৈকত সব জায়গাতেই নিরাপত্তা বার্তা পৌঁছাতে হবে।' তার মতে, ধারাবাহিক সচেতনতাই পারে প্রাণহানি কমাতে।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান বলেন, 'অনেক পর্যটক নিরাপদ সীমার বাইরে চলে যাওয়ায় দুর্ঘটনা ঘটে।'

তিনি জানান, এতদিন বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত ২৭ সদস্যের লাইফগার্ড দলকে সম্প্রসারণ, উন্নত প্রশিক্ষণ প্রদান এবং আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

জেলা প্রশাসকের ভাষ্য, কক্সবাজারে প্রতি বছর লাখ লাখ পর্যটক আসেন। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে লাইফগার্ড সেবার মানোন্নয়নে কাজ চলছে। এ বিষয়ে পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস পাওয়া গেছে।

জানা গেছে, কক্সবাজার বাংলাদেশের পর্যটনের প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের মতো গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন গন্তব্যে এখনও নিরাপত্তা অবকাঠামোর ঘাটতি স্পষ্ট।

লাল পতাকা থাকলেও নেই কার্যকর নজরদারি। লাখো পর্যটক থাকলেও নেই পর্যাপ্ত লাইফগার্ড। বিশাল সৈকতজুড়ে নেই আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম কিংবা সমন্বিত সচেতনতামূলক ব্যবস্থা। ফলে প্রতিবছরই আনন্দ ভ্রমণ পরিণত হচ্ছে শোকে, বাড়ছে অকাল মৃত্যু ও নিখোঁজের ঘটনা।

পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, পর্যাপ্ত লাইফগার্ড, আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম, বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা নির্দেশনা এবং সমন্বিত সচেতনতামূলক উদ্যোগ ছাড়া বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। নচেৎ নীল সমুদ্রের সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকবে মৃত্যুর অদৃশ্য ফাঁদ।

google news সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন